|
প্রতি বছরের মতো
এবারও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালিত হচেছ ৮ মার্চ-আন্-র্জাতিক নারী দিবস৷
নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান সকল প্রকার বৈষম্য নিরসন ও সমতা প্রতিষ্ঠার
লড়াইয়ের উচচকিত অঙ্গীকার ঘোষণা করাই সাধারণত এ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য৷
দিবসটির মূল চেতনা নিহিত নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের মধ্যে,
যার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিলো ১৮৫৭ সালে, নিউইয়র্কের একটি সুঁচ কারখানায় নারী
শ্রমিকদের জ্বলন্- বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে৷ সেদিনের নারী শ্রমিকদের বঞ্চনা
যেমন বিচিছন্ন কোনো ঘটনা ছিলো না, তেমনি সেদিনের বিদ্রোহও ছিলো না কোনো
বিচিছন্ন প্রতিবাদ৷ এটি ছিলো দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত যন্ত্রণা, অশ্রু আর
ক্ষোভের সংগঠিত বহিঃপ্রকাশ৷ পুলিশী নির্যাতন সেই অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে
দমিত করতে পারে নি৷ বরং নির্যাতিত নারীর লড়াকু প্রত্যয় নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব
বিবেককে৷ বিশ্বের সকল প্রান্-ে নিগৃহীত হতে থাকা নারীদের কাছে পৌঁছে
দিয়েছে সংগঠিত হবার আহবান৷ তাদের চেতনাকে করেছে উদ্দীপ্ত৷ তাদের ভীরু
প্রাণে জ্বেলেছে অনির্বাণ সাহসের শিখা৷ তারই ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে
জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত
সমাজতন্ত্রী নারীদের সম্মেলনে এ দিনটিকে আন্-র্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন
করার ঘোষণা দেন৷ পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চকে জাতিসংঘ দিবসটিকে
আন্-র্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়৷
আমাদের সংবিধানের ২৮(২) ধারায় বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্-রে
নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন”৷ কিন্তু, সংবিধানের এই বলিষ্ঠ ও
ন্যায্য প্রত্যয়টি আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনে যথাযথভাবে
বাস্-বায়িত হয় নি৷ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও, নারীরা এখনো অব্যাহতভাবে
অবদমন, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচেছ৷ ক্রমবর্ধমান এই নির্যাতন এবং
নির্যাতিত হবার ঝুঁকি নারীর মনোজগতে গভীর নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচেছ৷ তার
কর্মক্ষেত্র হয়ে পড়েছে সংকুচিত৷ ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, রাজনীতি,
প্রশাসন, ক্ষমতায় অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্-গ্রহণ প্রক্রিয়াতে নারীর অবস্থান
এখনও অত্যন্- দুর্বল৷ ইউনিসেফ ও অন্যান্য সংস্থার প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য
অনুযায়ী বাংলাদেশের নারী পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হল-
# শিক্ষা: ১১ বছর ও তদুর্দ্ধ বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুরুষদের চেয়ে নারীদের
সাক্ষরতার হার ৮ ভাগ কম (যথাক্রমে ৫৪ শতাংশ ৪৬ শতাংশ)৷ উচচশিক্ষার ক্ষেত্রে
এই হার নারী ৩৮ শতাংশ, পুরুষ ৬২ শতাংশ৷
# স্বাস্থ্য: প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৩৮০ জন৷ শতকরা ৫২
ভাগ নারী এখনো রক্তশূন্যতায় ভোগে৷ গর্ভকালে সে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত খাবার বা
বিশেষ যত্ন পায় না৷ এর পরিণতিতে এদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশু স্বল্প ওজন
নিয়ে জন্মগ্রহণ করে৷
# শ্রম: বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানী ক্ষেত্র পোষাকশিল্পে কর্মরত
শ্রমিকদের শতকরা ৮০ ভাগই নারী৷ এদের গড় বেতন মাসিক ৯৩০ টাকা৷ একই ক্ষেত্রে
পুরুষদের গড় বেতন ১৩০০ টাকা৷ অর্থাৎ মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের হার শতকরা ১৯
ভাগ৷ বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকদের শতকরা ৪৬ ভাগ নারী, যারা ন্যূনতম মজুরীতে
এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনা মজুরীতেও কাজ করে৷
# নির্যাতন: কেবলমাত্র সহিংসতার কারণে শতকরা ৭ ভাগ নারী মৃত্যুবরণ করছে৷
শতকরা ৪৭ ভাগ নারী তার অন্-রঙ্গ সঙ্গীর দ্বারা পরিবারে নির্যাতিত হয়৷
শারীরিকভাবে নির্যাতিত নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাতের সম্ভাবনা স্বাভাবিকের
তুলনায় দ্বিগুণ৷ এক্ষেত্রে স্বল্প ওজনবিশিষ্ট সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা প্রায়
চারগুণ এবং এসব সন্-ানদের জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি
স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪০ গুণ৷
নারীর প্রতি বঞ্চনার শেকড় প্রোথিত রয়েছে সমাজজীবনের গভীরে৷ বঞ্চনা ও
বৈষম্যের এই বাস্-বতা যত দীর্ঘায়িত হবে, জাতীয় উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়ন ততই
সুদূরপরাহত হয়ে উঠবে৷ তাই পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল
ক্ষেত্রে নারীর অধিকার সংরক্ষণ ও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি৷
এর মাধ্যমেই গোটা সমাজে অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম
হবে৷ তাই আমরা চাই-
- দেশের সকল রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র ও তাদের আসন্ন নির্বাচনী ইস্-েহারে
নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অন্-র্ভুক্ত করা এবং
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তা বাস্-বায়ন নিশ্চিত করা;
- নির্বাচন কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের সময় নারীর কার্যকর
অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্-াব গ্রহণ করা;
- জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন এবং অন্-ত শতকরা ৪০
ভাগ রোটেশনের ভিত্তিতে পূরণ করা;
- নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা;
- প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন ও আইনের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে
বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ বন্ধ এবং যৌতুক গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা;
- নারী পাচার, এসিড নিক্ষেপ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে
দৃষ্টান্-মূলক শাস্-ির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
- সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক নারী-পুরুষের সমতা ও
নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা৷
আসুন, আজকের এই আন্-র্জাতিক নারী দিবসে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে
অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে আওয়াজ তুলি-
বৈষম্য নয়, নারীর জন্য চাই সমতার পৃথিবী
|