সকল নির্যাতকের
বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব, নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা করব
আন্তর্জাতিক
নারী দিবস, ২০০৭
বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের
অংশগ্রহণে আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান, গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন এবং মনোজ্ঞ
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের আয়োজনে
আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত
“সকল নির্যাতকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব, নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা
করব” - এই শ্লোগানকে সামনে রেখে আন্-র্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আজ সকাল
৯টায় ঢাকার রমনা পার্কের শতায়ূ অঙ্গন সংলগ্ন গাবতলায় একটি বিশেষ আলোচনা সভা
অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা
সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ভাষা সৈনিক ড. হালিমা খাতুন-এর
সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক
উপদেষ্টা এবং আইন ও শালিস কেন্দ্রের নির্বাহি পরিচালক জনাব সুলতানা কামাল।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা ও শিশু বিষয়ক
অধিদপ্তর-এর সাবেক মহাপরিচালক জনাব নীলুফার বেগম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
মহাপরিচালক জনাব মস্য়ূদ মান্নান, ২০০৬ সালের রোকেয়া পদক প্রাপ্ত জনাব
রোকেয়া মান্নান, মানিকগঞ্জ সরকারী মহিলা মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ
অধ্যাপক মাহফুজা খানম, নারীনেত্রী জনাব তাজিমা হোসেন মজুমদার এবং জাতীয়
কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক জনাব নাছিমা আক্তার জলি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ড. হালিমা খাতুন বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার
বিষয়টি আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে এবং আশেপাশে দেখছি। তিনি বলেন,
নারীরা সংগ্রাম করছে, প্রতিদানও পাচ্ছে। কিন্তু যদি সমাজে সকলের
দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে তাহলে নির্যাতকের ও
নির্যাতনের শেষ হবে না। তিনি যৌতুককে নারী নির্যাতনের অন্যতম একটি উপাদান
হিসেবেও তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব সুলতানা
কামাল বলেন, নারীরা পিছিয়ে আছেন এই কারণেই নারী দিবসের প্রয়োজন আছে। তিনি
বলেন, ২০০৪ সালের নারী নীতিতে নারী অধিকারের অনেক ভালো ভালো দিকগুলিকে
বাতিল করা হয়েছে। আমাদের অধিকারগুলি যদি আমরা আদায় করতে চাই তাহলে আমাদের
আরো সচেতন হতে হবে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি উপস্থিত সম্মাননা প্রাপ্ত দু’জন
নারীর সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরে বলেন, কন্যাশিশুকে নিয়েও ভাবনার
প্রয়োজন আছে কারণ আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের নারী।
জনাব নীলুফার বেগম চীনসহ উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, নারীদেরকে সকল
পর্যায়ে ক্ষমতায়িত করার মধ্য দিয়ে
অভূতপূর্ব
পরিবর্তন আনা আমাদের দেশেও সম্ভব। জনাব মশুদ মান্নান নারীদের অবদানের ও
সাহসী ভূমিকার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে বলেন, আমাদের দেশেও সকল ক্ষেত্রে
নারীরা এগিয়ে আসবে এটাই প্রত্যাশা করি। তিনি বলেন, ভালো কাজের স্বীকৃতি
আসবেই। জনাব রোকেয়া মান্নান সকল নারীদের স্ব-স্ব অবস্থা ও অবস্থান থেকে
জেগে ওঠার আহবান রেখে বলেন, অধিকার কেউ হাতে তুলে দেয় না, অধিকার আদায় করে
নিতে হয়। অধ্যাপক মাহফুজা খানম নারী দিবসের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে বলেন,
নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৭ সালের নারীনীতি পুনর্বহাল করতে হবে।
জনাব তাজিমা হোসেন মজুমদার তৃণমূল পর্যায় থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের
ইতিবাচক ভূমিকার ও সংগ্রামী জীবনের কথা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করে বলেন, যে
কাজই করি না কেন আমরা লেগে থাকব। তিনি বলেন, লেগে থাকলে আমরা সফলকাম হবই।
জনাব নাছিমা আক্তার জলি বলেন, নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই এই দিবসটির
সূচনা হয়েছিল। তিনি বলেন, কিন্তু আজও নারীর অধিকার নিশ্চিত হয় নি। সেই
লক্ষ্যে আমাদের এখনো সংগ্রাম করে যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি নির্যাতকের
বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, কোন নির্যাতকই যাতে পার পেয়ে
যেতে না পারে।
এছাড়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধি, জাতীয়
কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সদস্য সংগঠনসমূহের প্রতিনিধি ও সদস্য, শিক্ষক,
অভিভাবক এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা
খোলামেলাভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ও তাদের মতামত তুলে ধরেন।
আলোচনা সভার এক পর্যায়ে নারীদের অবস্থা ও অবস্থানের ক্ষেত্রে অবদান রাখার
স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্র শিল্পী জনাব সাইদা খানম
এবং কুটির শিল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা জনাব জাহান আরা বেগমকে সম্মাননা
ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তাঁদের হাতে সম্মাননা
স্মারক হিসেবে ক্রেস্ট তুলে দেন। সম্মাননা গ্রহণের পর জনাব সাইদা খানম তার
সংক্ষিপ্ত অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ফোরামের পক্ষ থেকে সম্মান
জানানোর জন্য আমি আনন্দিত। তিনি বলেন, আমি যখন প্রথম ছবি তুলতে শুরু করি
তখন আমি মফস্বলে থাকার কারণে সেখানকার যে সামাজিক পরিবেশ ছিল তা থেকে বের
হয়ে আসাটা আমাদের জন্য খুব কঠিন কাজ ছিল। তিনি বলেন, আজকে শুধু বাইরেই নয়,
পারিবারিক জীবনেও নারীরা নির্যাতনের শিকার। তিনি বলেন, আজকে শীকল ভাঙার দিন
- অধিকার আদায়ের দিন। জনাব জাহান আরা বেগম বলেন, আজকে এত নারীদের দেখে আমি
আনন্দিত। তিনি কুটির শিল্পের মাধ্যমে নারীদের জন্য যে সমৃদ্ধির জায়গা তৈরি
হয়েছে তা সকলের জন্যই শিক্ষণীয় বলে উল্লেখ করেন।
আলোচনা সভার মাঝে মাঝে এবং শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ‘নারীর কথা’ শীর্ষক একটি গ্রন্থেরও মোড়ক
উন্মোচন করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন
প্রান্তরে নারীরা যখন নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের দেশের নারীরা তখন
বহুভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অগণিত নারী ও কন্যাশিশুর শারীরিক-মানসিক
নির্যাতনসহ ভয়াবহ নানা সহিংসতার চিত্র যেন এখানকার নিত্যদিনের বিষয়। ফলে
সৃষ্টি হচ্ছে নারীদের জন্য নিরাপত্তাহীনতা, ব্যাহত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক
জীবন। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে অনেককে জীবনও হারাতে হচ্ছে। এতে নারীর
মনোজগতে তৈরি হচ্ছে তীব্র ভীতি। শুধু তাই নয়, এর ফলে কর্মক্ষেত্রেও তাদের
অংশগ্রহণ হয়ে পড়ছে সংকুচিত।
নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোরই
প্রতিফলন। এই কাঠামোই নারীকে উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ করে
রেখেছে। বঞ্চনার ও বৈষম্যের এ বাস্বতা
যতই প্রসারিত হচ্ছে, জাতীয় উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়ন ততই হয়ে পড়ছে
বাধাগ্রস্থ। একইভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, রাজনীতি, প্রশাসন, ক্ষমতা
কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অবস্থান হয়ে উঠছে অত্যন্ত নাজুক। নারীর এই পশ্চাৎপদতা শুধু নারী
সমাজকেই নয়, গোটা সমাজকে পিছনে টানছে। যদিও আমাদের সংবিধানের ২৮(২)
অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্-রে নারী, পুরুষ সমান
অধিকার লাভ করিবেন।” কিন্তু সংবিধানের এই নির্দেশনাটি আমাদের রাজনৈতিক,
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
তাই উন্নয়নের চলমান প্রক্রিয়াকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে পরিবার ও সমাজ থেকে
উপড়ে ফেলতে হবে সকল ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন, গড়ে তুলতে হবে সংঘবদ্ধ
প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। প্রমাণ করতে হবে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন
প্রদর্শনকারীদের পার পেয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই - না পরিবারে, না সমাজে, না
রাষ্ট্রে। চলমান এই সকল বর্বরোচিত ও ভয়াবহ সামাজিক সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে
রুখে দাঁড়াতে হবে। নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার আদায়ের জন্য সর্বস্তরের
মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সকল প্রকার সহিংসতা নিরসনে নারী-পুরুষদের
সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
যে কোনো সচেতন মানুষই পারে নারী ও শিশুর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন ও
সহিংসতা দূরীকরণে নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে উচ্চ কন্ঠে প্রতিবাদ জানাতে,
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে
সমতার ভিত্তিতে একটি সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করতে এবং নারী
অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে।
এ প্রেক্ষিতে আজকের ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল চেতনা হোক ‘নারী
নির্যাতকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা
করা’। তাই আসুন, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর
অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা সকলে
মিলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই:
নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য মূলক সকল আইনের সংস্কার করে নির্যাতনকারীর
শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সোচ্চার থাকব;
নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার
বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব;
নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান সকল প্রকার বৈষম্য দূর করে, নারীর অধিকার
প্রতিষ্ঠা করব;
এ ধরণের অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে স্থানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ এবং এর
কুফল ও নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে তাদের সজাগ ও সক্রিয় করব;
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ ৯৭-এর পূণর্বহাল করার জন্য জনমত গড়ে তুলব;
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করব;
সিডও সনদের বাস্তবায়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাব;
শিক্ষা,স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল ক্ষেত্রে যথাযথ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার
বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করব।
প্রচারে: জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম ও এসিড সারভাইভর্স ফাউন্ডেশন