General Publications

 
Search  ...a  page
Main Links
 
standing Committee of Forum
 
নারীর কথা-৪

 

সম্পাদকীয়

নারী নির্যাতনের স্বরূপ ও আমাদের বিবেক

যে কথা যায় না বলা

আলোকিত আরতি
আসমা ও তার নারী কল্যাণ সংস্থা
আঁধারে আশার প্রদীপ
আত্মবিশ্বাসী দোলনা
আনোয়ারার সংগ্রাম চলছে
এলাচি কথন
এক নিরলস নারী সংগঠক
এক স্বাবলম্বী নারীর একান্ত কথা
এখন তিনি এলাকার সফল নেত্রী
কিশোরগঞ্জের শিখা: এক লড়াকু সংগ্রামী
জীবন সংগ্রামে জয়ী জাহানারা
জেসমিনের স্বপ্ন: আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ
দৃঢ় প্রত্যয়ী নাসিমা
রামুর নারী উন্নয়নের প্রতীক
লুৎফা: এক অনুপ্রেরণার নাম
সাজেদা মেম্বার হতে চায়
সাঈদা: অসহায় মানুষের পাশে
সব বাধাই হার মানলো
সাহস করেই স্বপ্ন দেখি
বাঘিয়ার বাহারজান
নকশিকাঁথা: জীবনের রঙিন ফোঁড়

ইভানের কথা

 

আঁধারে আশার প্রদীপ
সুব্রত কুমার পাল

  পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা এখনও পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি আমাদের দেশে৷ কিন্তু প্রবল আত্মবিশ্বাস আর আত্মশক্তি থাকলে যে নিজেকে বদলে ফেলা যায়, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন বগুড়ার দুপচাচিয়া উপজেলার সংগ্রামী নারী বিলকিস বানু৷

বিলকিসের স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন৷ একটি আদর্শ গ্রাম গড়ে তুলবেন৷ যে গ্রামের মানুষগুলো চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটিয়ে নিজেদের নিয়ে যাবে সম্ভাবনার শেষ প্রান্তে৷ কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দারিদ্র্য তার সে স্বপ্নে আঘাত হেনেছে৷ দারিদ্র্য একটি অভিশাপ এটি খুব সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন বিলকিস বানু৷ দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ পরিচালিত ‘নারী নেতৃত্ব বিকাশ প্রশিক্ষণ’ সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছে বলে জানালেন ছত্রিশ বছর বয়স্কা বিলকিস বানু৷

বগুড়া জেলার দুপচাচিয়া উপজেলার চামরুল ইউনিয়নের আঁকা বাঁকা মেঠো পথ ধরে চলা শান্ত ছোট গ্রাম জোহালি৷ বাংলাদেশের স্বাধীনতার দুই বছর পরই ১৯৭৩ সালে এ গ্রামে জন্ম নেন বিলকিস বানু৷ জন্মের পর বাবা নামে কাউকে ডাকার সৌভাগ্য হয়নি বিলকিসের৷ তিন মাস বয়সে বিলকিস বাবাকে হারান৷ পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে বিলকিসই সবার ছোট৷ বিলকিসের বাবা মারা যাওয়ার পরে তাদের যে সামান্য জমি ছিল তা ভাইরা ভাগাভাগি করে নেয়৷ তার মায়ের ভাগে ছিল মাত্র ৮ শতক জায়গা৷ যার উপর একটি মাত্র ঘর করে বিলকিসকে নিয়ে থাকতেন মা৷ মা ছিলেন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ধাত্রী৷

বিলকিসের বাবা মারা যাওয়ার সাথে সাথে তাদের পরিবারে নেমে আসে এক ভয়াবহ সংকট৷ ভাই থাকলেও বিলকিস ও তার মাকে দিশাহারা হয়ে ঘুরতে হয় মানুষের দ্বারে দ্বারে৷ এদিকে বিলকিসের মায়েরও স্বপ্ন ছিল মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক বানাবেন৷ এ আশায় প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যেও মেয়েকে গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন৷ বিলকিস লেখাপড়ায় ভালোই ছিলেন৷ চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় তাকে একা রেখে মা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন৷ বিদ্যালয়ে যাওয়া আর হয়ে ওঠে না৷ দেখারও কেউ ছিল না৷ বিলকিস তখন মেজোবোনের বাসায় আশ্রয় নেন৷ কিন্তু মেজোবোনেরও তখন খুব করুণ অবস্থা৷ দুলাভাইয়ের ছোট্ট ব্যবসায় যে সামান্য আয় হয় তা দিয়েই চলে সংসার৷ এই সংসারে একজন বাড়তি সদস্য তাদের কাম্য নয়৷ পরে বিলকিসকে মামার বাসায় নিয়ে আসা হয়৷
মামার বাসায় থাকা অবস্থায় বিলকিসের জীবনে ঘটে যায় একটা বড় ঘটনা৷ মামা মোজাহার হোসেন বিলকিসকে এক কাঁচা মালের ব্যবসায়ীর সাথে বিয়ে দিয়ে দেন৷ সংসার ও স্বামী কিছুই যখন তার বোঝার বয়স হয়নি, তখন মাত্র তেরো বছর বয়সে বিলকিসের বিয়ে হয়৷ বিয়ের সাত বছর পর যখন তার সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে, তখন ঘটে আরেক ঘটনা৷ বিলকিসের স্বামী তখন তাকে না জানিয়ে আরেকটি বিয়ে করেন৷ বিলকিস এই ঘটনা জানতে পেরে কষ্ট পান এবং কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারেননি৷ তিনি সন্তানদের নিয়ে ভাইদের বাড়িতে আশ্রয় নেন৷ ভাইয়েরা সদয় হয়ে তাকে বসবাসের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করে দেন৷

বিলকিস তার সন্তানদের নিয়ে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন৷ অন্যের বাড়িতে কাজ করে, বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করে কোনোমতে দিনাতিপাত করছিলেন তিনি৷ চারদিক থেকে শুধু হতাশা, দারিদ্র্য, ক্ষুধা তাকে কুরে কুরে খাচিছল৷ একদিন হঠাৎ করে খবর পেলেন, তার স্বামী তৃতীয় বিবাহ করেছেন এবং তাকে তালাক দিয়েছেন৷ এরপর বিলকিস মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েন৷ সংসার তছনছ হয়ে যায়৷ এ অবস্থায় বিলকিসের এক চাচাত বোন তার দায়িত্ব নেন৷ তার বাড়িতেই রাখেন বিলকিসকে৷ তার দুই সন্তানের মধ্যে মেয়েকে তার মেজোবোন নিয়ে যান, আর ছেলেকে এক শাড়ির দোকানে কর্মচারী হিসেবে রাখেন৷ বিলকিসের জীবন চলতে থাকে আশ্রিতা হয়ে ৷

দীর্ঘ পাঁচটি বছর ভাইয়ের বাড়িতে থাকার পর তিনি চিন্তা করেন, এভাবে বসে বসে আর কত দিন! একটা কিছু করা দরকার৷ শুরু হলো নতুন করে আবার পথ চলা৷ বোনের নিকট থেকে ১০০০ টাকা ধার করে শুরু করেন জীবিকার সন্ধান৷ কিছু শাড়ি দোকান থেকে নিয়ে আসেন৷ ঘরে বসে থেকে প্রথমে বিক্রি শুরু করলেন৷ শাড়ি বিক্রি করে যে সামান্য আয় হতো তা দিয়ে তার নিজের ব্যক্তিগত খরচ চলতো৷ এমনই এক সময় বিলকিসের পরিচয় হয় দুপচাচিয়া উপজেলার নারীনেত্রী পারুল বেগমের সাথে৷ এ-কথা সে-কথায় তার জীবনকাহিনী বলে ফেলেন৷ পারুল বেগম সব কথা জানার পর বিলকিসকে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের পরিচালনায় রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত ‘নারীনেতৃত্ব বিকাশ ফাউন্ডেশন প্রশিক্ষণ’ নেওয়ার কথা বলেন৷ বিলকিস এ প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী হন৷ বাধা দেন বিলকিসের মেজোবোন৷ দুলাভাইকে রাজি করিয়ে বিলকিস ২০০৮ সালের ২৭-২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত ৩২তম ব্যাচে রাজশাহীতে প্রশিক্ষণ নেন৷

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিলকিস নিজেকে আবিষ্কার করেন ভিন্ন জগতের মানুষ হিসেবে৷ তিনি ভাবতে থাকেন, এতদিন যে জগতে ছিলেন সেখানে এই সমাজের মানুষ নারীকে নারী হিসেবেই দেখতো, মানুষ হিসেবে নয়৷ তারা পায়নি তাদের ন্যায্য মানবিক অধিকার৷ প্রশিক্ষণ শেষে পরিকল্পনা করে, তার গ্রামকে কুসংস্কার ও অন্ধকারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার৷ বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের মতো সামাজিক অভিশাপ থেকে গ্রামটিকে বাঁচানোর৷ পিছিয়ে পড়া নারীদের সামনে নিয়ে আসার পরিকল্পনাটিও বাদ যায়নি৷ বিলকিস জানান, আমাদের ঘর ছেড়ে রাজপথে নামতে হবে, নইলে আমাদের মুক্তি নেই৷

তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন৷ পাশের গ্রামের এক মেয়েকে বাল্যবয়সে বিয়ে দেয়ার খবর পেয়ে বিলকিস কয়েকজনকে সাথে নিয়ে চলে যান বাড়িতে৷ প্রথমে মেয়ের মা-বাবাকে বুঝানোর চেষ্টা করেও না পেরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে জানালে তাদের সহযোগিতায় বিয়ে বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মেয়েটির পরিবার৷ এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আশেপাশের গ্রামের প্রায় দশটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করে৷

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কাজ করেই ক্ষান্ত হননি জোহালী গ্রামের নারীনেত্রী বিলকিস বানু৷ যৌতুকবিহীন বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন৷ আর এ সকল কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতি সপ্তাহের বুধবার বিকেলে তার নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় বৈঠক করেন৷ বিলকিস জানান, তিনি প্রতিটি প্রশিক্ষণের পর গ্রামে ফিরে প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো নিয়ে সবার সাথে আলোচনা করেন৷

নিজেরা সংঘবদ্ধ হয়ে থাকার জন্য তারা ‘মাটিহাস মহিলা সমবায় সমিতি’ হিসেবে একটি সমবায় সমিতি গঠন করেন৷ সমিতি গঠনের প্রথমদিক থেকে সপ্তাহে তারা ২৫ টাকা করে জমাতে থাকেন৷ বিলকিসের নেতৃত্বে প্রতি বুধবার তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন৷ ২০ জন নারীকে নিয়ে সমিতির যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এ সমিতির সদস্য সংখ্যা ৩৬ জন৷ এ সমিতির বর্তমান তহবিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা৷ সমিতির সদস্যরা সমস্যায় পড়লে এ তহবিল থেকে সুদমুক্ত ঋণ নিয়ে থাকেন৷ কেউ কেউ সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে সেলাই মেশিন ক্রয়, হাঁস-মুরগি পালন, ছাগল পালন, গরু পালন করে তাদের সংসারকে আরো স্বাবলম্বী করেছেন৷

এখন ‘মাটিহাস মহিলা সমিতি’ তার গ্রামে এক প্রতিষ্ঠিত সংগঠন৷ নারীর অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন শুধু এ সমিতির লক্ষ্য নয়৷ বিলকিস বানুর নেতৃত্বে এই সমিতির সবাই মিলে এ পর্যন্ত গ্রামে ৪টি বাল্যবিবাহ ও ৩টি যৌতুক নিয়ে বিয়ে বন্ধ করেছেন৷ সমিতির কার্যক্রম দেখে গ্রামের পুরুষ মানুষ অবজ্ঞা করলেও দিন বদল হয়েছে এখন৷ নারীদের এ পরিবর্তনের দৃশ্য দেখে পুরুষরাও আর থেমে নেই৷ উৎসাহ আর উদ্দীপনা বিরাজ করছে তাদের মাঝেও সমিতির কার্যক্রম দেখেই গ্রামের মানুষ এখন বুঝতে পারছেন, বাল্য বিবাহ, নিরক্ষরতা, যৌতুক আসলেই সমাজের শত্রু, দেশের শত্রু৷ সমিতির সদস্যরাও এখন আগের চেয়ে চিন্তা- চেতনায় অনেক অগ্রসর৷ সমিতির কেউ এখন গৃহিনী পরিচয়ে নয়, একজন মানুষ হিসেবেই সকলের কাছে পরিচিতি পেতে চান৷

বিলকিস বানু এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বী ও আত্মসচেতন একজন মানুষ৷ সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে শাড়ির ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছেন৷ শাড়ি বিক্রি করে তার এখন মাসিক আয় প্রায় ৭ হাজার টাকা৷ তার ভাষায়, ‘এখনও হয়তো আমি ফেরি করে শাড়ি বিক্রি করি, কিন্তু খুব অল্প দিনের মধ্যেই আমার একটি নিজের শাড়ির দোকান হবে৷ সেদিন আর বেশি দূরে নয়৷’

বিলকিস বানু এখন স্বপ্ন দেখেন নতুন জীবনের৷ হতাশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে বিলকিস বানু এখন অাঁধারে আশার প্রদীপ হয়ে জেগে আছেন৷

 

 
 

National Girl Child Advocacy Forum

 

Contact Us

3/7 Asad Avenue Mohammodpur, Dhaka-1207

Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975, Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net