|
|
রামুর মেয়ে দিলরুবা৷ কখনো কখনো
ঝর্ণার মত চঞ্চল হলেও দিলরুবা ভাবেন বেশির ভাগ সময়ই রামুর
নয়নাভিরাম ছোট ছোট টিলার মতোই ভাবগম্ভীর৷ শৈশব থেকেই কী যেন
ভাবেন মেয়েটা৷ সমাজ, সংসার, পৃথিবী, মানুষ তার সব সময়ের ভাবনা৷
আর তখন থেকেই অন্যের দুঃখে দুঃখী আর অন্যের সুখে সুখী হওয়াটা
দিলরুবার স্বভাবজাত৷ যে কারণে যে বয়সে সমাজের আর দশটা মেয়ে ঘর
সংসারের স্বপ্ন বোনে, সে সময় দিলরুবার ভাবনা নারীর মুক্তি, তার
ক্ষমতায়ন, তার আত্মনির্ভরশীলতা, মা ও শিশুর সুস্থ জীবন৷
সর্বোপরি মানুষের উন্নত জীবন৷ তবে দিলরুবার ভাবনা কোনো
স্বপ্নবিলাসীর মতো শুধু ভাবনাতেই আটকে থাকেনি৷ ভাবনার সাথে যোগ
হয়েছে কর্মেরও৷
অবশ্য তার আগে দিলরুবাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেকটা পথ৷
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তাকে নিতে হয়েছে সমাজকর্মের
হাতেখড়ি৷ স্থানীয় নাদেরুন্নেছা উচচ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ
করার পর দিলরুবা ভর্তি হন রামু ডিগ্রি কলেজে৷ ২০০৭ সালে যথারীতি
তিনি এইচএসসি পাশ করেন৷ এরই মধ্যে তার সাথে পরিচয় ঘটে
কক্সবাজার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক রফিকুল ইসলামের৷
যার আমন্ত্রণেই দিলরুবা ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে ১২২১তম উজ্জীবক
প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ দিলরুবার জন্য যা ছিল সত্যিই অভিনব৷ এ
যেন অন্য এক জগৎ৷ যেখানে সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একটি সুখী
সমৃদ্ধশালী আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ায়৷ দিলরুবা নিজেও
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন৷ এই প্রশিক্ষণেই তিনি পরিষ্কার ধারণা পান
নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন ও যৌতুক প্রতিরোধ, সম্পদের সঠিক
ব্যবহার এবং নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যসহ নানা বিষয়ে৷
এরপরই মূলত দিলরুবার সেই ভাবনাগুলো বাস্তবতার দেখা পায়৷ তিনি
মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেন সমাজকর্মের৷ দিলরুবার এমন ইচছায় বাধা
হয়ে দাঁড়ায়নি তার পরিবার৷ বরং সহযোগিতার হাত বাড়িয়েই এগিয়ে
এসেছে৷ কারণ দিলরুবার বাবা মোজাম্মেল হক নিজেও একজন সমাজকর্মী৷
যে কারণে দিলরুবার কোনো কষ্ট হয়নি নিজের বাড়িটাকে কর্মস্থল
হিসাবে ব্যবহারের৷ রামু পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সহযোগিতা নিয়ে
দিলরুবা শুরু করে দেন তার সমাজসেবা৷ প্রথমেই গ্রামের গর্ভবতী
মা এবং শিশুদের প্রতি নজর দেন তিনি৷ কারণ তিনি খুব ভালো করেই
জানেন গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে সুস্থ শিশুর
জন্মদান সম্ভব নয়৷ আর সুস্থ শিশুর জন্ম সম্ভব না হলে এবং শিশু
মৃত্যুরোধ করা না গেলে দেশের উন্নয়নও অসম্ভব৷ তাই সঠিক সময়ে
প্রতিটি শিশুকে টিকা দিতে তিনি গ্রামের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা
চালান৷ বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশু এবং শিশুর মায়েদের ও ডেকে ডেকে টিকা
কেন্দ্রে পাঠান৷ গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন জটিলতা এড়াতে
পরামর্শ দেন তিনি৷ এজন্য প্রতিমাসে অন্তত একবার নিজ বাড়িতে এসব
মায়েদের নিয়ে বৈঠকের আযোজন করেন তিনি৷
একই সাথে তিনি নজর দেন গ্রামের কিশোর কিশোরীদের প্রতি৷ কারণ
দিলরুবা তার নিজের জীবন দিয়েই বুঝতে পেরেছেন, অল্প বয়সী এসব
কিশোর-কিশোরীদের মনের ব্যথা৷ এরা না পরিণত মানুষ না অপরিণত৷ ফলে
ঝামেলাটা বাঁধে ওখানেই৷ কেউ তাদের শিশু মনে করে, আবার কেউ ভাবে
বয়স্ক মানুষ৷ এসব দেখে প্রতিটি কিশোর-কিশোরীরই মুষড়ে পড়া
স্বাভাবিক৷ কারণ কেউ তাদের সাথে সঠিক আচরণটি প্রায় সময়ই করে
না৷ উপরন্তু তাদের শারীরিক পরিবর্তনগুলোও অস্বস্তির কারণ হয়ে
দাঁড়ায় তাদের নিজেদের কাছেই৷ বিশেষ করে কিশোরীদের৷ যে
ব্যাপারগুলো দিলরুবার খুব ভালোভাবেই জানা৷ তাই বয়ঃসন্ধিকালীন
শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন বিষয়ে এসব কিশোরীদের সচেতন করে
তোলার পাশাপাশি তাদের ৫টি বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেন তিনি৷ ফলে
দিলরুবার গ্রাম পানিরছড়া তো বটেই আশপাশের গ্রামের মা, শিশু ও
কিশোরীরা বিশেষভাবে উপকৃত হচেছন৷
দিলরুবা খুব ভালো করেই জানেন, একটি নির্ভর গ্রামের প্রধান
শর্তই তার আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা৷
যেজন্য তিনি গ্রামের স্যানিটেশন ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন
আনতে সক্ষম হয়েছেন৷ গ্রামের ১২৫টি পরিবারের মধ্যে বর্তমানে
অন্তত ৩০টি পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করছে৷
সংখ্যাটি প্রতিদিনই বেড়েই চলছে৷ তবে দিলরুবার বিশ্বাস, চলতি
বছরের মধ্যেই গ্রামের সমস্ত মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা
ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হবেন৷
এছাড়া যৌতুক আর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও দিলরুবার প্রচারণা থেমে
নেই৷ এরই মধ্যে তিনি গ্রামে এ বিষয়ে চারটি সভা সফলভাবে শেষ
করেছেন৷ যেখানে গ্রামের নারী ও কিশোরীদের তিনি এর কুফল সম্পর্কে
পরিষ্কার ধারণা দিয়েছেন৷ এবং এসব রোধের কর্মপদ্ধতিও আলোচনা
করেছেন৷ এছাড়া যুববান্ধব কর্নার ক্লাবের মাধ্যমে তিনি গ্রামের
কিশোর-কিশোরীদের সচেতন করে তুলছেন৷ এজন্য তিনি মাসে অন্তত ২টি
করে ক্লাস নিচেছন৷ যেখানে তিনি ১২ জন ছেলে এবং ১২ জন মেয়েকে
বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক ও মানসিক যে পরিবর্তনগুলো ঘটে সে সম্পর্কে
পরিষ্কার ধারণা দিচেছন৷
পুরো রামুকে আরও সুন্দর আরও সবুজ করার লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণের
বিকল্প নেই৷ দিলরুবা সেখানেও পিছিয়ে নেই৷ এরই মধ্যে তিনি ৩০০টি
চারাগাছ লাগিয়েছেন৷ এত কিছুর পরও দিলরুবার স্বপ্ন কিন্তু একজন
ভালো প্যারামেডিক হওয়া৷ আর একজন ভালো প্যারামেডিক হওয়ার
মাধ্যমেই দিলরুবা পেতে চান গর্ভবতী মা ও শিশুর পরম বন্ধুতা৷ আর
এভাবেই রামুর মতো একটি প্রত্যন্ত এলাকায় দিলরুবা এগিয়ে চলেছেন
সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে৷ তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচছা থাকলে অনেক
প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখা সম্ভব৷ দিলরুবা
উপলদ্ধি করেছেন, কিশোর-কিশোরী ও নারীদের উন্নয়নই একদিন ব্যাপক
সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি রচনা করবে৷
|
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |