|
|
সম্পাদকীয়
ড. বদিউল আলম মজুমদার
আমাদের মোট
জনসংখ্যার প্রায় তিন কোটি কন্যাশিশু৷ সমাজে নারী-পুরুষে
সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা
প্রয়োজন৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে কন্যাশিশুরাই সবচেয়ে
বেশী অবহেলা, বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার৷ তাদের প্রতি এ আচরণ
দৃশ্যমান পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে৷ তবে গত দেড়
দশকে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গৃহীত অনেকগুলো বাস্তবমুখি
পদক্ষেপের কারণে কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে এখন একধরনের জনসচেতনতা
সৃষ্টি হয়েছে৷ ফলে এ বিষয় নিয়ে আজ অনেকেই সোচচার৷ ‘কন্যাশিশু
এডভোকেসী ফোরামে’র সাথে জড়িত সংগঠনগুলো ও ব্যক্তিরা এ সোচচার
জনগোষ্ঠির একটি বড় অংশ৷ তাদের উদ্যোগেই কন্যাশিশুদের বৈষম্যহীন,
নিরাপদ বিকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রতিবছর ৩০শে
সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ পালিত হয়৷ এবারও যথাযথ
মর্যাদার সাথে দিবসটি পালিত হচেছ৷ এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়
‘উত্ত্যক্তকারীর শাস্তি - কন্যাশিশুর মুক্তি’৷
উত্ত্যক্ততা আজ আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে৷
এটি এখন আর শুধু ‘ইনোসেন্ট ফান’ বা নিষপাপ আনন্দের পর্যায়ে নেই৷
এটি এখন অনেকের জন্য জোরপূর্বক বিয়ে, এলাকা বা স্কুল ত্যাগ,
এমনকি আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ শুধুমাত্র উত্ত্যক্ততার
কারণে গত ৪ বছরে বাংলাদেশের ২৮ জন কিশোরী আত্মহত্যা করেছে৷
কিন্তু তা সত্ত্বেও উত্ত্যক্ততা এখনও অনেকের কাছে গুরুতর অপরাধ
হিসেবে গন্য হয়না৷
উত্ত্যক্ততা প্রতিরোধের জন্য যথাযথ আইন প্রয়োজন, যা আমাদের দেশে
নেই৷ যে আইনগুলো বহাল আছে সেগুলোরও প্রয়োগ নেই বললেই চলে৷
দণ্ডবিধি আইনের ৫০৯ ধারা ও ২৯৪ ধারা এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ
অধ্যাদেশের ৭৫ ও ৭৬ ধারা উত্ত্যক্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ কিন্তু
এগুলোর তেমন কোন কার্যকারিতা নেই৷ এছাড়া উত্ত্যক্ততার ক্ষেত্রে
প্রযোজ্য বিদ্যমান আইনকেও শিথিল করা হয়েছে৷ যেমন, ‘নারী ও শিশু
নির্যাতন দমন আইন ২০০০’-এ ইভটিজিং-কে যৌন হয়রানির একটি ধরন
হিসেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল৷ কিন্তু
অপব্যবহারের কারণে ২০০৩ সালে আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে যৌন
হয়রানির শর্তগুলোকে শিথিল করা হয়েছে৷ ফলে এর আওতায় ইভটিজিং-এর
ঘটনার আইনি প্রতিকার পাওয়া এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
আমাদের দেশে উত্ত্যক্ততার শিকার ব্যাক্তি বা পরিবার সহজে
আদালতের শরনাপন্ন হতে চাননা৷ কারণ এক্ষেত্রে উত্ত্যক্ততার
শিকার মেয়েটিকেই প্রমান করতে হবে তাকে কোন মন্তব্য, কোন
অঙ্গভঙ্গি করা হয়েছিলো যা তার জন্য হয়রানীমূলক ছিলো ইত্যাদি৷
এভাবে আইনের আশ্রয় চাওয়াটাই অপমানজনক হওয়ায় উত্ত্যক্ততার
অভিযোগে সাধারনত কোন পুলিশ কেস পাওয়া যায়না৷ এছাড়াও বিচার
প্রক্রিযায় রয়েছে অযাচিত দীর্ঘসূত্রিতা৷
নিঃসন্দেহে উত্ত্যক্ততা আজ আমাদের সমাজে একটি গুরুতর অপরাধী
কর্মকান্ডে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিকার জরুরি৷ আর এর প্রতিকারের
জন্য সরকার, বেসরকারী সংস্থা, মিডিয়া ও সচেতন নাগরিক সমাজসহ
সকলকে এগিয়ে আসতে হবে৷ সরকারকে আইনগুলোর যথাযথ সংস্কার করতে হবে,
যাতে এগুলো ‘ভিকটিম ফ্রেন্ডলি’ হয় এবং উত্তক্ততার যারা শিকার
তাদের জন্য আইনের আশ্রয় নেওয়া সহজ হয়৷ সর্বোপরি আইনগুলোকে
কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে৷
উত্ত্যক্ততা প্রতিরোধে সমাজের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকদের এবং
সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে৷ গড়ে তুলতে হবে একটি
সামাজিক আন্দোলন৷ এমনি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ২০০০ সালে
অনেকগুলো উন্নয়ন সংগঠন আর নাগরিকদের উদ্যোগে গঠিত হয় ‘জাতীয়
কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরাম’৷ ফোরামের উদ্যোগে ‘জাতীয় কন্যাশিশু
দিবস’ পালনের সাথে সাথে সারাবছরব্যাপি দেশজুড়ে কন্যাশিশুদের
নিরাপদ বিকাশের বিভিন্ন কর্মসুচি পালন করা হয়৷ প্রতি বছরের মতো
এবারও কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন ও রচনা
প্রতিযোগীতা, বিতর্ক,র্ যালি, বিভিন্ন পত্রিকায় বিশেষ
ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে৷ একইসাথে প্রকাশ করা হলো
‘কন্যাশিশু-৪’ সংকলনটি৷
কন্যাশিশুদের জন্য একটি সুন্দর আগামির প্রত্যাশায় যে সকল লেখক
তাদের মুল্যবান নিবন্ধ দিয়ে এ সংকলনটিকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের
সকলকে জানাচিছ আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা৷ অভিনন্দন ফোরামের
সদস্যদেরকেও, যারা সংকলনটি প্রকাশে ও প্রস্তুত প্রক্রিয়ায়
সহায়তা করেছেন৷ আগের মতো এবারও নিবন্ধনগুলোকে লেখকের নামের
বর্ণানুক্রমে সাজানো হলো৷ আশা করি পাঠকরা আমাদের সীমাবদ্ধতা ও
মুদ্রণজনিত ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন৷
সফল হোক কন্যাশিশুর বৈষম্যহীন সুন্দর ভবিষ্যতের লক্ষ্যে সকলের
সম্মিলিত প্রচেষ্টা! |
|