|
|
’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ তৎকালীন সাড়ে
সাত কোটি মানুষের জন্য একটি স্বাধীনভূমির স্বীকৃতি এনে দেয়৷
কিন্তু কতিপয় সুবিধাবাদীদের দখল-বেদখল খেলার কবলে পরে অনেক
দুর্ভাগ্যবানরা হয়ে পড়ে ভূমিহীন৷ যুদ্ধের বিশৃঙখলায় পরে তাদের
অনেককেই উচেছদ হতে হয় প্রিয় পূর্ব-পুরুষদের ভিটা থেকে৷ এমনই এক
ভাগ্যহত পরিবারের সন্তান শিখা৷
শিখা রানী দেবী৷ পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া
উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের নিশ্চিতপুর গ্রামে৷ যুদ্ধে
উচেছদ হয়ে যাওয়া শিখার দিশাহারা পরিবার শহরের রথখোলা এলাকায়
একটি স্যাঁতস্যাঁতে মাটির ছোট্টঘর ভাড়া নিয়ে থাকত৷ তখন খেয়ে-না
খেয়ে কোনোরকমে মানবেতর জীবনযাপন করত শিখার পরিবার৷ শিখার জন্ম
১৯৭৭ সালের ১৫ই নভেম্বর রথখোলার সেই মাটির ঘরে৷ বাবা হীরালাল
ছিলেন একটি সিনেমা হলের সামান্য কর্মচারী আর মা বাসনা রানী দেবী
গৃহিণী৷ দু ভাই দু বোনের মধ্যে শিখা সবার ছোট৷
শিশুকাল থেকেই শিখার আচরণ ছিল পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে
অনেকটা ব্যতিক্রমী৷ অভাবের তাড়না, আজ খেলাম তো কাল কী খাব সে
দুর্ভাবনায় শিখার বাবা যখন হতাশ হয়ে বলতেন ‘আর মনে হয় পারলাম
না’৷ তখন ছোট্ট শিখা ওই বয়সেই বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলত,
‘বাবা আমি আর একটু বড় হই, দেখবে আমাদের আর কোন অভাব থাকবে না’৷
বাবা যেন অবুঝ এই শিশুটির এতটুকু সান্ত্বনাতেও বেঁচে থাকার
অনুপ্রেরণা পেতেন৷ তাই পরের দিন অভুক্ত থেকে আবারো ছুটতেন
সিনেমা হলের কাজে৷ শিখার মা অনেকটা বাস্তববাদী, বিচক্ষণ এবং
স্বাধীনচেতা হওয়ায় এত কষ্টের মধ্যেও ভাইদের পড়াশোনাটা বন্ধ হয়নি৷
তবে যতটুকু খেয়ে শেষ হয় তাতে দু’ ভাইয়ের কেউই পরিবারের হাল
ধরার মতো অবস্থায় পৌঁছতে পারেনি৷ টিউশনি করে নিজের জীবনের
ন্যূনতম ব্যয়টুকু মেটাতে পারতো শুধু৷
এভাবে চলতে থাকে বেশ কটা বছর৷ শিখা ১৯৯৫ সালে জেলা সরণী
বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন৷ শিখার সহপাঠীরা যখন উচচ
শিক্ষার জন্য নামি-দামি কলেজে ভর্তির জন্য ব্যস্ত; তখন শিখা
গেলেন শহরের গাইটাল এলাকার ব্র্যাক অফিসে৷ উদ্দেশ্য ছোটখাটো
কোনো চাকরি জোটে কি-না৷ দরিদ্র পরিবারের শিখা ছিলেন
পুষ্টিহীনতার শিকার৷ ফলে বয়স অনুপাতে শারীরিক বৃদ্ধি না ঘটায়
দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্র্যাক কর্মকর্তা বললেন, ‘এত ছোট মেয়ে, তুমি
এসেছো চাকরি করতে!’ শিখা বাইসাইকেল চালাতে জানতেন৷ কঠোর
পরিশ্রম করতেও রাজি আছেন৷ কিন্তু এতসব যুক্তি দেখানোর পরও তাকে
ফিরে আসতে হয় শূন্য হাতে৷
অথচ পরিবারের প্রচণ্ড ুঅভাবও আর সহ্য করার মতো নয়৷ তাই মাটির
ব্যাংকের সঞ্চয় আর মায়ের অাঁচল থেকে নেওয়া মাত্র ১৫০ টাকা নিয়ে
১৯৯৫ সালে শিখা নিজের বাড়িতেই শুরু করে মশলার ব্যবসা৷ উদ্দেশ্য
পড়াশুনা চালানো আর অভাবের বিরুদ্ধে একটু লড়াই করা৷ প্রায় ছয়
মাস চলে ব্যবসাটি, পুঁজি দাঁড়ায় ১০-১২ হাজার টাকা৷ মায়ের নামে
নাম দেয়া হয় ‘বাসনা মসলা’৷ কিন্তু এক রাতে শিখাদের দুর্বল ঘর
প্রবল বৃষ্টির ধারা সামলাতে না পারায় ঘরে থাকা সকল মসলা ভিজে
যায়৷ এর পরের কয়েক দিন ভালোমতো রোদ না ওঠায় ছত্রাক পরে নষ্ট হয়ে
যায় সব মসলা৷ মসলা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর শিখা নিজ
বাড়িতে একটি দেশি মুরগির খামার চালু করেন৷ কিন্তু পূর্ব
অভিজ্ঞতা না থাকায় এক বিরল মুরগির মড়ক দেখা দেয় এবং এক পর্যায়ে
নিঃশেষ হয়ে যায় তার ফার্মের সকল মুরগি৷
অদম্য শিখা আবারও শপথ নেন ঘুরে দাঁড়ানোর৷ তাই নতুন আশা নিয়ে
চাকরি নেন হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে৷ এবার হয়তো
দুঃখ ঘুচবে৷ কিন্তু এখানেও বিধিবাম দু মাস যেতে না যেতেই বোঝা
গেল চাকরির নামে তারা যা করছে তা আসলে প্রতারণা৷ পরিবার থেকে এ
ধরনের অনৈতিক শিক্ষা না পাওয়ায় প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিখা
এখান থেকেও ফিরে আসেন৷ এবার শিখা অনুভব করতে পারেন তার পিঠটা
একেবারেই দেয়ালে ঠেকে আছে; তাই পিছনে যাওয়ার পথ আর কোথায়? তাই
তাকে নিতে হয় যাওয়ার শপথ৷ ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি শিখা তার এলাকার
নারী ও পুরুষদের সংগঠিত সমিতির মাধ্যমে সঞ্চয় কার্যক্রম শুরু
করেন এবং পরবর্তীতে উক্ত সঞ্চয়ের টাকা থেকে দরিদ্র
নারী-পুরুষদের নামমাত্র লাভে ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেন৷
জনতা প্রকল্প নামে এ সংগঠনটি সমাজসেবা থেকে নিবন্ধন লাভ করে এবং
ধীরে ধীরে গোটা শহরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে এর কাজ ছড়িয়ে পড়ে৷
এভাবে শিখাদের পরিবারে যখন একটু পরিবর্তনের হাওয়া লাগতে শুরু
করে৷ ঠিক তখন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান শিখার বাবা৷
বাবার হঠাৎ মৃত্যু শিখার কাছে মনে হলো বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো৷
এবার শুরু হলো তার জীবনের আসল সংগ্রাম৷ কারণ তার আপন ভাইয়েরাই
হয়ে ওঠলো তার প্রত্যক্ষ শত্রু৷ বাবার মৃত্যুর শোক না ভুলতেই
শুরু হলো দুই বৌদিদের মধ্যে সংসারের চাবি দখলের যুদ্ধ৷ ফলে
সংসারে শিখার অবস্থানটি হয়ে ওঠলো খড়কুটোর মতো৷ এ অবস্থায় শিখা
যেহেতু তাদের প্রতিপক্ষ তাই শুরু হলো তাকে যেনতেন একটি পাত্রের
কাছে কোনো রকমে তুলে দেওয়ার পাঁয়তারা৷
এমন অস্থির সময়ের মধ্যেও শিখা ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ থেকে
এইচএসসি পাশ করেন৷ এ ঘটনা শিখাকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয়৷ শিখা
তাই ওই সময় বিয়ে করতে রাজি হতে পারেননি৷ কিন্তু বিয়েতে রাজি না
হওয়ায় তার পরিবার থেকেই নানা ধরনের চাপ আসতে থাকে৷ সে চাপ সামলে
এগিয়ে যাওয়া দুরূহ হলেও অসম্ভব হতে পারেনি শিখার জন্য৷ এই যখন
অবস্থা তখন শিখার পরিবার অন্য ফন্দি অাঁটে৷ শিখার ভগ্নিপতি এবং
তার কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে প্রচারণা চালাতে শুরু করে যে, এ
ধরনের কাজ কোনো ভালো মেয়ে করে না, শিখা নষ্ট হয়ে গেছে৷ সে
পরিবারের মান সম্মান নষ্ট করছে৷ সুতরাং তাকে অবশ্যই তার জনতা
প্রকল্প বন্ধ করতে হবে৷
কিন্তু তত দিনে জনতা প্রকল্পের পুঁজির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪
লক্ষ টাকায় পৌঁছে গেছে৷ যেখানে ঋণগ্রহীতাদের প্রতি শিখার ছিল
অনেক দায়বদ্ধতা৷ কিন্তু এর মধ্যে পরিবারের একমাত্র আপনজন তার
মাও একদিন হঠাৎ তাকে ছেড়ে চলে যান৷ ফলে শিখা বাস্তবিকই একা হয়ে
পড়েন৷ আর এই সুযোগে তার ভগ্নিপতি শিখার বিরুদ্ধে ৭ লক্ষ টাকা
চুরির অভিযোগ এনে সংস্থাটিকে বন্ধ করার জন্য জেলা সমাজসেবা
অফিসে যোগাযোগ করেন৷ কিন্তু শিখা যথাযথ প্রমাণ হাজির করায় এ
যাত্রায়ও বেঁচে যান তিনি৷
কিছুতেই যখন কিছু হল না, তখন তার হতোদ্যম ভগ্নিপতি নানান কথার
সূত্রধরে শিখার সাথে সরাসরি কলহে জড়িয়ে পড়েন৷ এক্ষেত্রে শিখার
দুই ভাইও ভগ্নিপতির পক্ষ নিয়ে শিখাকে বেধড়ক মারধর করে৷ শিখা
তখন প্রকৃত অথের্ই বুঝতে পারেন, আপন ভাইয়েরা যেখানে ঘোর শত্রু
সেখানে আর কোনোভাবেই থাকা যায় না৷ ওই দিনই শিখা এক কাপড়ে বাড়ি
থেকে অজানার উদ্দেশ্যে বের হয়ে আসেন৷ রাস্তায় বের হয়ে ভাবতে
থাকেন, এখন তিনি কোথায় যাবেন৷ ভাবনা বেশি দূর অগ্রসর হয় না৷
কারণ শিখার পরিচিত এমন কেউ নেই যে তাকে এই দুঃসময়ে আশ্রয় দিতে
পারেন৷ ফলে শহরের গৌরাঙ্গবাজার এলাকায় তার যে এক কামরার অফিসটি
ছিল সেখানেই উঠে পড়েন৷ এখানে কোনোরকম একটা মাস পার করেন শিখা৷
তারপর হঠাৎ একদিন তার মনে পড়ে বান্ধবী ববির কথা৷ যাকে তিনিই এক
বছর আগে একটা মেস ঠিক করে দিয়েছিলেন৷
শিখা আর দেরি না করে ববির কাছে যায় এবং একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই
প্রার্থনা করেন৷ নরসিংদীর মেয়ে ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজের
অনার্সের ছাত্রী ববির আন্তরিকতায়ই সেদিন শিখার আশ্রয় মিলেছিল৷
এরপর থেকে ববি আর শিখা ওই মেসেই এক সাথে থাকতে শুরু করে৷ কিন্তু
ববির থাকা খাওয়া ও পড়ালেখার খরচ তার বাড়ি থেকে আসলেও শিখার তো
সে জায়গাটি শূন্য৷ তাই জীবন বাঁচানোর জন্য কিছু একটা করার
বিকল্প থাকে না৷ অবশেষে অনেক ভেবে দুই বান্ধবী মিলে মাত্র ১২
হাজার টাকায় ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজের সামনে একটি ছোট্ট
স্টেশনারি দোকান চালু করেন৷ এক্ষেত্রে মেসের মালিকও তাদের
সহযোগিতা করেন৷
এরপর শিখার জীবনে সাফল্যে ছোঁয়া লেগেছে৷ শিখা আর ববির দিন-রাত
পরিশ্রমে স্টেশনারী দোকানটি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিপার্টমেন্টাল
স্টোরে পরিণত হয়েছে৷ যার বর্তমান পুঁজির পরিমাণ দেড় লক্ষ
টাকারও বেশি৷ জনতা প্রকল্পে কাজ করার সময় একটি ভোজ্য পণ্যের
বিপণন ও বিতরণের কাজে শিখা মাত্র ৫০০০ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন৷
শিখার সেই পুঁজি বেড়ে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকা৷ শিখা
২০০৬ সালে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ আয়োজিত ‘প্রত্যাশা,
প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্রম’ শীর্ষক একদিনের কর্মশালায় অংশগ্রহণ
করেন৷ এরপর ৬-৮ ডিসেম্বর, ২০০৭ ময়মনসিংহের প্রশিকা প্রশিক্ষণ
কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের ১৮তম ব্যাচে
প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ এর পরই মূলত নারীনেত্রী হিসাবে
কিশোরগঞ্জে শিখার গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রভাব বাড়তে থাকে৷
সব মিলিয়ে শিখা আজ কিশোরগঞ্জ জেলার নারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি
সম্মানজনক আসন গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন৷ এর স্বীকৃতিস্বরূপ অতি
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ জেলার নারী ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বদানকারী
সংগঠন উইমেন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য হিসেবে
তাকে নির্বাচন করা হয়েছে৷ ঢাকার সোনার গাঁ শেরাটন হলে বেশ
কয়েকটি জাতীয় উদ্যোক্তা মেলায় শিখা অত্যন্ত সম্মানের সাথে
অংশগ্রহণ করেছেন৷ বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও
তার সাফল্যের কাহিনী প্রচারিত হয়েছে৷ সর্বোপরি শিখা আজ একজন
সফল ব্যবসায়ী৷ পাশাপাশি পড়াশুনাতেও আর ক্ষান্ত নেই৷ ওয়ালি
নেওয়াজ খান কলেজের অর্নাস তৃতীয় বর্ষে চলছে তার পড়াশুনা৷
যে আপনজন শিখাকে একদিন বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, শিখা আর
সেখানে ফিরে যেতে চান না৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বর্বর
নিষ্ঠুরতা তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন, এখন তার
লড়াই সেই অমানবিকতার বিরুদ্ধে৷ তাই তার আশেপাশে যখন কোনো মেয়ে
বিপদগ্রস্ত হয়, তখন নিজের সর্বশক্তি দিয়ে শিখা ঝাঁপিয়ে পড়েন
অন্যায়ের বিরুদ্ধে৷ শিখার বন্ধু মাসুদ, কায়েস, শাহেদ এবং
এলাকাবাসী বলেন- আমরা পুরুষ হিসেবে সমাজে সুবিধাজনক অবস্থায়
থেকে যা পারিনি, শিখা একজন সাধারণ নারী হয়ে তা করে আমাদের চোখ
খুলে দিয়েছেন৷ তাই সবার কাছে শিখা আজ উন্নয়নের এক জীবন্ত মডেল৷
|
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |