General Publications

 
Search  ...a  page
Main Links
 
standing Committee of Forum
 
নারীর কথা-৪

 

সম্পাদকীয়

নারী নির্যাতনের স্বরূপ ও আমাদের বিবেক

যে কথা যায় না বলা

আলোকিত আরতি
আসমা ও তার নারী কল্যাণ সংস্থা
আঁধারে আশার প্রদীপ
আত্মবিশ্বাসী দোলনা
আনোয়ারার সংগ্রাম চলছে
এলাচি কথন
এক নিরলস নারী সংগঠক
এক স্বাবলম্বী নারীর একান্ত কথা
এখন তিনি এলাকার সফল নেত্রী
কিশোরগঞ্জের শিখা: এক লড়াকু সংগ্রামী
জীবন সংগ্রামে জয়ী জাহানারা
জেসমিনের স্বপ্ন: আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ
দৃঢ় প্রত্যয়ী নাসিমা
রামুর নারী উন্নয়নের প্রতীক
লুৎফা: এক অনুপ্রেরণার নাম
সাজেদা মেম্বার হতে চায়
সাঈদা: অসহায় মানুষের পাশে
সব বাধাই হার মানলো
সাহস করেই স্বপ্ন দেখি
বাঘিয়ার বাহারজান
নকশিকাঁথা: জীবনের রঙিন ফোঁড়

ইভানের কথা

 

নারী নির্যাতনের স্বরূপ ও আমাদের বিবেক
ড. বদিউল আলম মজুমদার*

  কয়েকদিন আগে ‘দৈনিক প্রথম আলো’তে ‘বর, নাকি বর্বর!’ শিরোণামে একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক সংবাদ প্রকাশিত হয়৷ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের কদমতলি গ্রামে অনুষ্ঠিত ঘটনাটির বিবরণ, রিপোর্টারের ভাষায়, নিম্নরূপ: ‘খাবারের তালিকায় অনেক কিছুই ছিল৷ পোলাওয়ের সঙ্গে গরু, খাসি ও মুরগীর মাংস, চিংড়ি মাছ, সবজি, সালাদ- সবই৷ ছিল না শুধু ডিম৷ এ নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বরযাত্রীরা৷ মেয়ের বাবা তাদের বোঝাতে চেষ্টা করেন, এক সঙ্গে ৭০০ লোকের খাওয়ার জন্য ডিম তিনি বাজারে পাননি৷

‘কিন্তু বরযাত্রীরা নাছোড়বান্দা৷ খাবারের সঙ্গে ডিম থাকার পাকা কথা হয়েছে৷ কাজেই ডিম তাদের চাই৷

‘শেষমেষ মুরববীদের মধ্যস্থতায় আপাতত ডিম-সমস্যার সমাধান হয়৷ বরপক্ষ ডিম না খেয়েই নববধূকে নিয়ে রওনা দেয়৷ বরের বাড়ী পৌঁছে বধূবরণ শেষ করতে না-করতেই শুরু হয় খোঁটা৷ নববধূ ও তাঁর পরিবারকে হেয় করতে চলতে থাকে আজেবাজে কথা৷ চলে গালাগাল৷ চোটপাট সবচেয়ে বেশি বরের নিজের৷ তাঁর ক্ষোভ যেন কিছুতেই মেটে না৷ এক পর্যায়ে নববধূকে বসিয়ে তাঁর মাথায় একে একে ১৯টা ডিম ভাঙেন বর নিজেই৷ ডিমের আঘাতে মাথা ফুলে অসুস্থ নববধূ এখন হাসপাতালে৷’ (প্রথম আলো, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯)

নিঃসন্দেহে ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের একটি অভাবনীয় রূপ ও জঘন্যতম দৃষ্টান্ত৷ তবে প্রথম আলোর ফলোআপ রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, পরবর্তীতে মো. হান্নান নামের এই দুবাই প্রবাসি বর তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং কনেকে বাড়ি নিয়ে যায়৷ মনে হয় যেন জঘন্য ঘটনাটির পরিণতি আপাতত শুভ হয়েছে৷

কিন্তু নারী নির্যাতনের অনেক ঘটনারই পরিণাম শুভ হয় না৷ অনেকক্ষেত্রে তা হয় করুণ৷ তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছিল রংপুরের বদরগঞ্জ পৌর এলাকার শাহাপাড়া গ্রামে৷ এ ঘটনাটিও ‘দৈনিক প্রথম আলো’তে ‘যৌতুকের টাকার সামান্য কিছু বাকি ছিল বলে...’ শিরোণামে প্রকাশিত হয়৷ রিপোর্টার আলতাফ হোসেন দুলালের ভাষ্য অনুযায়ী: ‘দাবি করা যৌতুকের এক লাখ ৬০ হাজার টাকার মধ্যে নগদ এক লাখ বরপক্ষ পাওয়ার পর বিয়ে রেজিস্ট্রি করানো হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি৷ কথা হয়, বাকি ৬০ হাজার টাকা কনে তুলে দেওয়ার দুই দিন আগে দেবে কনে পক্ষ৷ এরপর উভয় পক্ষ বিয়ের কার্ডও বিলি করে৷

‘অনেক চেষ্টা করে কনের কৃষক বাবা ৪০ হাজার টাকা যোগাড় করে ২১ ফেব্রুয়ারি বরের বাড়িতে পাঠান৷ টাকা কম দেখে ক্ষুব্ধ হন বরের বাবা৷ কনের ভাইকে সাফ জানিয়ে দেন, বাকি ২০ হাজার টাকা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা কনে তুলে আনবেন না৷ যেমন কথা তেমন কাজ! টাকা না পেয়ে বিয়ের নির্ধারিত দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি তালাক দেয়া হয় কনেকে৷’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯)

‘দৈনিক প্রথম আলো’র একই সংখ্যায় (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯) এ ধরনের নির্যাতনের আরেকটি খবর প্রকাশিত হয়৷ মো. সুমন মোল্লার নামে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী: ‘সৌদিফেরত রহমত আলীর সঙ্গে মাস চারেক আগে বিয়ে হয় তরুণীটির৷ কিছুদিন পর গর্ভে নতুন অতিথির আগমন টের পান তিনি৷ খবরটি স্বামীকে দিতেই খুশির বদলে তার চোখ-মুখে ফুটে উঠে বিরক্তির ছাপ৷ মুহূর্তেই রেগে ফেটে পড়ে স্বামী৷ শুরু হয় মারধর৷ তারপর চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা বলে রহমত ১২ ফেব্রুয়ারি বিদেশে পাড়ি জমান৷

‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার ওই নববধূর দুঃখের কাহিনী এখানেই শেষ নয়৷ স্বামী চলে যাওয়ার পর তাঁর ভাইয়েরা কোন কারণ ছাড়াই তাঁকে বেদম পেটায়৷ কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি জানান, তিনি অন্তঃসত্ত্বা৷ এ কথা শুনে আরো ক্ষেপে যায় তারা৷ এরপর একের পর এক লাথি মারতে থাকে তাঁর পেটে৷ যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকলে স্বামীর রেখে যাওয়া তালাকনামা তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়৷ খবর পেয়ে বাবা-মা এসে ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান৷’ তাঁর পেটের বাচচা নষ্ট হয়ে গেছে বলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নিশ্চিত করেন৷

অনেকক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের পরিণতি মর্মান্তিকও হয়৷ তেমনি একটি কাহিনী ‘দৈনিক প্রথম আলো’র একই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়৷ ঝালকাঠি থেকে নিজস্ব প্রতিনিধি প্রেরিত ‘স্ত্রী ও কন্যাকে জবাই করে আত্মসমর্পণ করলেন কমল!’ শিরোণামের রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ঝালকাঠি সদর উপজেলার শতদলকাঠি গ্রামের কমল শীল (৩৮) তার সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রীতা রানী শীল (৩২) ও আট বছর বয়সী কন্যা বৃষ্টি শীলকে জবাই করে হত্যার পর থানায় আত্মসমর্পণ করেন৷ প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভাষ্য মতে, নাপিতের পেশায় নিয়োজিত কমলের সাথে তাঁর স্ত্রীর প্রায় ঝগড়া হতো৷ সম্ভবত এ কারণেই তিনি স্ত্রী ও পুত্রকে জবাই করে হত্যা করেন৷

লক্ষণীয় যে, একদিনের একটি পত্রিকা ‘প্রথম আলো’তেই নারী নির্যাতনের তিনটি কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে৷ এ সকল নির্যাতনকারীরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা৷ তাদের পেশা ভিন্ন৷ ধর্ম ভিন্ন৷ সামাজিক অবস্থানও ভিন্ন৷ অর্থাৎ বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ব্যাপক এবং তা সমাজের সর্বস্তরে ও সর্বপ্রান্তে বিরাজমান৷ নির্যাতনের ধরনও বৈচিত্র্যময়৷ নির্যাতন শুধু শারীরিক সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অনেকক্ষেত্রে তা মানসিক নিপীড়নেরও রূপ নেয়৷ আবার ক্ষেত্রবিশেষে রূপ নেয় খাদ্য-পুষ্টির মতো জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর সুযোগের বঞ্চনায়৷

আরও লক্ষণীয় যে, প্রায় সকলক্ষেত্রে পরিবারই নারী নির্যাতনের প্রধান উৎস৷ পারিবারিক অঙ্গনেই নির্যাতন ও নিপীড়নের প্রায় সকল ঘটনা ঘটে থাকে, যদিও রাষ্ট্র থেকেও ন্যায্য প্রাপ্য নারীরা অনেক সময় পায় না৷ নির্যাতনবিরোধী আইনি কাঠামোও নারীদের জন্য সহায়ক নয়৷

মানসিক নিপীড়নের একটি বৈশিষ্ট্য হলো যে, এর জন্য নির্যাতনকারীদের কোনো শাস্তি হয় না৷ শারীরিক নির্যাতনের জন্য থানা-পুলিশে যাওয়া যায়৷ আদালতে সহিংসতার অভিযোগ প্রমাণ করা যায়, যদিও তা অনেকক্ষেত্রেই দুরূহ৷ কিন্তু মানসিক নিপীড়নের কথা বায়বীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, তাই প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকে তা মুখ বুজে সহ্য এবং এর ক্ষত আজীবন বহন করতে হয়৷

নারীর প্রতি নির্যাতন ও নিপীড়ন নিঃসন্দেহে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুন্ন করে - বাংলাদেশের সংবিধান নারীর কতগুলো অধিকারের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি দিয়েছে৷ আরো ক্ষুণ্ন করে তাদের সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার৷ একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যে সকল নারীরা নির্যাতিত হন তারা আমাদের সমাজেরই মানুষ, আমাদের কারো না কারোর আত্মীয়-স্বজন৷

নারী নির্যাতনের পরিণতি শুধু নারীদেরকেই দিতে হয় না, এর মাশুল পুরো সমাজকেই গুণতে হয়৷ অপুষ্ট নারীরা স্বল্প ওজনের সন্তান প্রসব করে৷ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত নারীরা রুগ্ন সন্তান পেটে ধারণ করে৷ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নারীদের সন্তান অশিক্ষিত থেকে যাওয়ারই সম্ভাবনা বেশি৷ ইত্যাদি ইত্যাদি৷

নারী নির্যাতনের পরিণতি অনেক সময় ভয়াবহ এবং পুরো সমাজকে এর মাশুল গুণতে হলেও, এর ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা অনেকক্ষেত্রেই আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না - যদিও বিবেক হলো ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে বিভাজন করার সবচেয়ে বড় বিচারক৷ বস্তুত যুগ যুগ ধরে বিরাজমান পুরুষতন্ত্রের সংস্কৃতি আমাদের বিবেককে যেন ভোঁতা করে দিয়েছে৷ ফলে নারীর প্রতি নিগ্রহ আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে পড়েছে৷ তাদের বঞ্চনা অনেক সময় আমাদের কাছে স্বাভাবিক বলেই মনে হয়৷ অনেকক্ষেত্রে মনে হয় তা তাদের ‘প্রাপ্য’৷ আবার অনেক সময় নারী নির্যাতনের ঘটনাকে অজুহাত হিসাবে আমরা ‘পুরুষ নির্যাতনে’র ধূয়া তুলি, যদিও কালেভদ্রে তা ঘটে থাকে৷

পরিশেষে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নারী নির্যাতন আমাদের সমাজে ব্যাপক এবং বহুরূপে তা প্রতিভাত হয়৷ এ নির্যাতন আমাদের গা-সহা হয়ে গেলেও, তার পরিণতি আমাদের সকলকেই ভুগতে হয়৷ বস্তুত, নারীর প্রতি বঞ্চনা পুরো সমাজকেই বঞ্চিত করে - একটি সুন্দর উন্নত ও উৎপাদনশীল ভবিষ্যৎ থেকে৷ তাই জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে আজকে সকল সচেতন নাগরিককে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে৷ গড়ে তুলতে হবে এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ৷ করতে হবে এর প্রতিকার৷ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার৷

 

 
 

National Girl Child Advocacy Forum

 

Contact Us

3/7 Asad Avenue Mohammodpur, Dhaka-1207

Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975, Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net