|
|
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রয়োজনীয়তা এখন বিতর্কের উধের্ব৷
একটি যৌক্তিকতা হলো যে, এর মাধ্যমে নারীর সর্ব ক্ষেত্রে সমতা ও
সম-সুযোগের অধিকার নিশ্চিত হবে৷ আর এ অধিকার গণতান্ত্রিক
ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য, কারণ গণতন্ত্র হলো জনগণের -
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল জনগণের - সম্মতির শাসন৷ তাই সমাজের
অর্ধেক জনগোষ্ঠি হিসেবে নারীকে বাদ দিয়ে কিংবা তাদের নামমাত্র
প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট শাসন কাঠামোকে কোনভাবেই
গণতান্ত্রিক বলা যুক্তিযুক্ত হবে না৷ এ কারণেই আমাদের
সংবিধানের ৯, ১০, ১৯(১) ও ২৮(২) নারীর সম-অধিকার ও রাজনৈতিক
ক্ষমতায়নের বিষয়ে বলিষ্ঠ অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে৷
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আরেকটি বাস্তব কারণ হলো যে,
রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমেই নারীর প্রতি বিরাজমান বঞ্চনা,
অবহেলা ও নিগ্রহের অবসান ঘটবে৷ আর একথা আজ সর্বজন স্বীকৃত যে,
নারীর পশ্চাৎপদতা পুরো সমাজকেই পেছনে টেনে রেখেছে৷ ‘অপুষ্টির
দুষ্টুচক্র’ এর নারী অনাগ্রহী বাহক, যা সমাজে অপুষ্টির অভিশাপকে
বংশ পরম্পরায় টিকিয়ে রাখছে৷ ব্যাপক অপুষ্টির কারণে আমাদের
জনগণের যথাযথ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যহত হচেছ এবং জাতি
তাদের উৎপাদনশীলতা থেকে বঞ্চিত হচেছ৷ এছাড়াও ‘ফিটাল
প্রোগ্রামিং’-এর কারণে অপুষ্ট মায়েদের গর্ভজাত স্বল্প ওজন নিয়ে
জন্মগ্রহণ করা শিশুরা পরবর্তী জীবনে অধিকহারে হৃদরোগ ও
বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হচেছ৷ ভ্রুন থেকে ভবিষ্যৎ নিয়তি
নির্ধারণের কারণেও জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হচেছ৷
আমাদের জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে বিদ্যমান
নারী প্রতিনিধিত্বের ব্যাপ্তি ও পদ্ধতি নারীর রাজনৈতিক
ক্ষমতায়নের পক্ষে সহায়ক নয়৷ সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে
২০০৪ সালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫এ উন্নীত
করা হয়৷ একইসাথে সরাসরি নির্বাচনের পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের
দ্বারা সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংরক্ষিত আসনের
নারী সদস্যদের নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা হয়৷ স্থানীয় সরকার
প্রতিষ্ঠানসমূহেও ১৯৯৭ সাল থেকে নারীদের জন্য একটি সংরক্ষণ
পদ্ধতি বিরাজমান৷ এ পদ্ধতিতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন
পরিষদে প্রতি তিনটি সাধারণ আসনের জন্য নারীদের জন্য একটি
সংরক্ষিত আসনের বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷ এ পদ্ধতিতে
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচিত সদস্যদের
এক-চতুর্থাংশ নারীদের জন্য সংরক্ষণের আওতায় আসে৷
জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে নারী
প্রতিনিধিত্বের বিদ্যমান পদ্ধতি নারীদেরকে রাজনৈতিকভাবে
ক্ষমতায়িত করার পরিবর্তে তাদেরকে অলংকারিক ভূমিকাই প্রদান করে৷
নারীরা সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠি হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় সংসদে
নারীর প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৩ শতাংশ (45`345)৷ স্থানীয় সরকার
প্রতিষ্ঠানসমূহেও এ প্রতিনিধিত্বের হার (চেয়ারম্যান/মেয়রসহ )
২৫ শতাংশের কম৷ এছাড়াও এ ধরনের ‘প্রতীকি’ প্রতিনিধিত্ব
নারীদেরকে ক্ষমতা কাঠামোতে ‘অন্তর্ভুক্ত’ না করে তাদেরকে ক্ষমতা
কাঠামোর বাইরেই রাখে৷ উপরন্তু জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের
বিদ্যমান পদ্ধতি দলীয় নেতৃত্বের নারীদেরকে‘ ‘পেট্রনেজ’ বা ফায়দা
প্রদানের হাতিয়ারে পরিণত করে৷
বিদ্যমান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে, ৩ জুন, ২০০৭ তারিখে
গঠিত ‘স্থানীয় সরকার গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি’ (শক্তিশালীকরণ
কমিটি) নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী
সুপারিশ পেশ করে৷ মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে ১৩ নভেম্বর
২০০৭ তারিখে জমা দেয়া রিপোর্টে কমিটি স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে
নারীদের জন্য ৪০ শতাংশ আসন ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষিত করার
প্রস্তাব করে৷ সুপারিশে এই সংরক্ষণ পদ্ধতিকে তিন টার্মের জন্য
সীমিত এবং দুই টার্মের পর এটিকে পুনর্মুল্যায়নের প্রস্তাব করা
হয়৷ ‘শক্তিশালীকরণ কমিটি’র রিপোর্টের সাথে সাথে আইনের খসড়াও
তৈরি করে দেয়, যাতে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল৷
ঘূর্ণায়মান পদ্ধতির ফলে প্রত্যেক নির্বাচিত স্থানীয় সরকার
প্রতিনিধির নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা এবং একইপদে নারী-পুরুষ
নির্বিশেষে প্রত্যেকের একই ক্ষমতা ও দায়দায়িত্ব থাকবে৷ এ কথা
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুপারিশটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয়
সরকারে নারী প্রতিনিধিদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তো, তাদের
ক্ষমতার বলয়ের সাথে অন্তর্ভুক্ত (inclusive) হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি
হতো এবং তাদের সত্যিকারের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হতো৷ এছাড়া
এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদেও নারী প্রতিনিধিত্বকে অর্থবহ করা পথ
সুগম হতো৷
কিন্তু দুভাগ্যবশত সরকারের সর্বোচচ পর্যায়ের সুষপষ্ট
প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, ‘শক্তিশালীকরণ কমিটি’র সুপারিশ
বাস্তবায়িত হয় নি৷ যেমন, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ‘কমিটি’র
রিপোর্ট ও খসড়া আইনগুলো গ্রহণের পর পরই মন্ত্রণালয়কে এগুলো
বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন৷ একইদিনে মাননীয় স্থানীয় সরকার
উপদেষ্টা একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন
শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন৷ এছাড়াও ৫ জানুয়ারি ২০০৮ তারিখে
দশ সহস্রাধিক স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত
এক সমাবেশে সরকারের পক্ষ থেকে কমিটি’র সুপারিশের সারাংশ
উপস্থাপন করা হয়৷ সমাবেশে আবারো মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা
মন্ত্রণালয়কে সুপারিশগুলো মূল্যায়ন ও দ্রুত বাস্তবায়নের
নির্দেশ প্রদান করেছেন বলে জানান৷
এমনকি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে মন্ত্রণালয় স্থানীয়
সরকারের জন্য যে খসড়া অধ্যাদেশগুলো প্রণয়ন করে তাতে ঘূর্ণায়মান
পদ্ধতিতে প্রথম নির্বাচনে নারীদের জন্য ৪০ শতাংশ এবং পরবর্তী
দুই নির্বাচনে ৩০ শতাংশ করে আসন সংরক্ষণের বিধান অন্তর্ভুক্ত
করা হয়৷ এ বিধানটিই ২৩ মার্চের উপদেষ্টা পরিষদের সভায়
নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়৷ যা এর এক মাস পরের উপদেষ্টা পরিষদের
২৪ এপ্রিলের সভায় পরোপুরি উল্টে দিয়ে স্থানীয় সরকারে নারী
প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে মূলত পূর্বের বিধানকেই পুনর্বহাল করা
হয়৷ এটি একটি নাটকীয় পরিবর্তন এই অর্থে যে, কেবিনেটে নীতিগতভাবে
অনুমোদিত কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অতীতে দুই-একটি ক্ষেত্র
ছাড়া খুব কদাচিতই পরিবর্তন করা হয়েছে৷ কেন এমন হলো?
প্রসঙ্গত, মার্চ-এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ
ঘটনা ঘটে, যার সাথে উপদেষ্টা পরিষদের নাটকীয় সিদ্ধান্তের কোন
যোগসূত্রতা আছে কি না তা অনেকের মনে প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে৷
স্মরণ করা যেতে পারে যে, ৮ মার্চ, ২০০৮ তারিখে নারী সমাজের
দাবির প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন
নীতিমালা-২০০৮’ ঘোষণা করেন৷ ঘোষণার পর একটি বিশেষ গোষ্ঠী এর
বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং সহিংস প্রতিবাদে লিপ্ত হয়৷ পরবর্তীতে গত
২৭ মার্চ ২০০৮ তারিখে চারজন মাননীয় উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র
সচিবের সাথে আলেম-ওলামাদের আলাপ-আলোচনার প্রেক্ষিতে বায়তুল
মোকাররম মসজিদের ভারপ্রাপ্ত খতিবকে আহবায়ক করে ২০ সদস্য
বিশিষ্ট একটি নারী নীতি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয় এবং কমিটি
গত ১৭ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে তার রিপোর্ট পেশ করে৷ লক্ষ্যণীয় যে,
পর্যালোচনা কমিটি’র রিপোর্টে নারী নীতিমালার ১০.৫, ১০.৬ এবং
১০.৭ অনুচেছদ বাতিল করার সুপারিশ করেছে৷ উল্লেখ্য যে, এ তিনটি
অনুচেছদে জাতীয় সংসদে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ এবং
স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এ
সকল আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে৷
পর্যালোচনা কমিটির মতে, এ তিনটি ধারা ‘ইসলাম, গণতন্ত্র ও
সংবিধান পরিপন্’্থি এবং এগুলো ‘পুরুষের ক্ষেত্রে চরম
বৈষম্যমূলক এবং নারীদের ক্ষেত্রে চরম পক্ষপাতদুষ্ট’৷
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে যে, ২০০৩ সালে খুলনা
সিটি কর্পোরেশনের দশজন মহিলা কমিশনারের একটি মামলার রায়ের
প্রেক্ষিতে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং বিচারপতি মোঃ মিফতাহ
উদ্দিন চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন
বেঞ্চের ১৬ আগষ্ট, ২০০৪ তারিখে প্রদত্ত রায়ের প্রেক্ষিতে
উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে (রিট পিটিশন
নং- ৩৩০৪/২০০৩)৷ মন্ত্রণালয়ের এ যুক্তি অগ্রহণযোগ্য এবং মনে হয়
নিতান্তই অজুহাত মাত্র৷ কারণ মামলাটি ছিল নারী কমিশনারদের প্রতি
দায়িত্ব বন্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টিকারী ২৩/৯/২০০৩ তারিখের
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি পরিপত্রের বিরুদ্ধে৷
মামলার রায়ে বৈষম্য দূর করার জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ প্রদান
করে বলা হয়: ‘... নারী ও পুরুষ উভয়ই জন্মগতভাবে স্বাধীন ও সমান,
কিন্তু ঐতিহাসিক কারণে তাদের প্রতি অসম ব্যবহার করা হয়েছে৷
যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা অসম নন৷ তাদের উভয়ের জন্মগত সমানাধিকার
রয়েছে, তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হোক বা না হোক৷ কিন্তু তা
যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল৷ আমাদের সংবিধান এ অসমতার ব্যাপারে
সচেতন এবং তা দূর করার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এটি
সংবিধানের কাম্য৷ এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, রাষ্ট্রের সকল
কর্মকর্তা-কর্মচারীর অস্তিত্ব সংবিধানের ওপর নির্ভরশীল এবং তারা
এর নির্দেশ মানতে বাধ্য৷’
(‘... men and women are born free
and equal but due to historical reasons, they are treated as
unequals but not that they are unequals, they are clothed
with inherent equal rights whether it is formally recognized
or not and sooner it is so recognized the better. The
Constitution recognized so and wanted the Government to take
necessary steps to amend such inequality. It should also be
remembered that all functionaries of the State owe its
existence to the Constitution and bound by its commands.’)
উপরোক্ত রায়ে দায়িত্বের ক্ষেত্রে সমতার কথা বলা হলেও,
দুর্ভাগ্যবশত এটিকে স্থানীয় সরকারে নারী প্রতিনিধিত্ব খর্ব
করার জন্য অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ
অনাকাঙিক্ষত৷ বাংলাদেশের সংবিধান, যা দেশের সর্বোচচ আইন,
অঙ্গীকার করেছে যে, ‘রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ
সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহ
দান করিবেন এবং এই সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে কৃষক, শ্রমিক এবং
মহিলাদিগকে বিশেষ প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হইবে’ (অনুচেছদ-৯)৷
এছাড়াও কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলায় [৪৪ডিএলআর(এডি)(১৯৯২)]
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১৯৯২ সালে এক সর্বসম্মত
রায়ে মন্ত্রণালয়কে স্থানীয় সরকারের সকল স্তরে ছয় মাসের মধ্যে
নির্বাচন করার সাথে সাথে সংবিধানের ৯ অনুচেছদের বিশেষ
প্রতিনিধিত্বের বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেয়ার নির্দেশ প্রদান
করেন৷ এমনকি বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি মোঃ মিফতাহ
উদ্দিন চৌধুরীও তাদের ২০০৪ সালের রায়ে অতীতের বৈষম্যের জন্য
ক্ষতিপূরণের কথা বলেন: ‘(১) নারী ও পুরুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে
সমান অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে৷ (২) সংবিধান এই সমতা নারী
অধিকারের স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি তা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক
আচরণের কথা স্বীকার করে এবং এই ক্ষতি পূরণ করার জন্য পদক্ষেপ
নেয়ার অনুমতি দেয়৷’
[1) Men and women have got equal rights
and obligations in all spheres of life, 2) The Constitution
recognizes such equality and while upholding the said rights
of women, acknowledges unequal treatment towards them, as
such, permitted taking of necessary remedial measures.’] তাই
পশ্চাৎপদতা দূরীকরণের স্বার্থে নারীদেরকে বিশেষ প্রতিনিধিত্ব
প্রদানের লক্ষ্যে তাদের জন্য ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে আসন সংরক্ষণ
সংবিধান এবং দেশের সর্বোচচ আদালতের রায়ের সাথে সম্পূর্ণ
সঙ্গতিপূর্ণ হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা৷
এছাড়াও নির্বাচনে দাঁড়ানো একটি আইনি অধিকার
(statutory right) এবং নারীদের জন্য বিশেষ প্রতিনিধিত্ব একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার
(constitutional commitment)৷ কোন নির্বাচনী এলাকার ওপর কারোরই
জন্মগত অধিকার নেই এবং তা তার জন্য বাধ্যবাধকতাও নেই৷ যেমন,
প্রতিবেশি ভারতে বর্তমানে নির্বাচনী এলাকার সীমানা
পুনঃনির্ধারণের কাজ চলছে এবং এর ফলে লোকসভার স্পীকার সোমনাথ
চট্টোপাধ্যায়ের নির্বাচনী এলাকা আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত হয়ে
যাবে, যে বিষয়ে কারোরই কিছু করার থাকবে না৷ উপরন্তু, সমতার
যুক্তিই যদি ব্যবহার করা হবে, তাহলে সাংবিধানিক অঙ্গীকারানুযায়ী
বিশেষ প্রতিনিধিত্ব প্রদানের লক্ষ্যে জাতীয় ও স্থানীয় সকল
পর্যায়ে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করাই যুক্তিযুক্ত
হবে! উল্লেখ্য যে, ভারতের অনেক প্রদেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোতে
ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি অনেকদিন থেকে বিরাজমান, যা ভারতীয় আদালত
সংবিধান পরিপন্থি বলে ঘোষণা করে নি৷
আমরা শুনেছি যে, নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি
ভঙ্গের একটি বড় কারণ দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার
নির্বাচন অনুষ্ঠানের আকাঙক্ষা৷ ঘুর্ণায়মান পদ্ধতি বাস্তবায়নের
জন্য প্রয়োজন হবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং
প্রস্তুাবিত স্থানীয় সরকার কমিশনের পরামর্শ সাপেক্ষে নারীদের
জন্য আসন চিহ্নিত করা, যা একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার৷ শুধুমাত্র
সংসদভিত্তিক ‘আংশিক’ গণতন্ত্রের পরিবর্তে জাতীয়-স্থানীয় সকল
স্তরে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে ‘পূর্ণ’ গণতান্ত্রিক
পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার পক্ষে আজ অনেক নাগরিকই৷ কিন্তু কী মূল্যের
বিনিময়ে? কেন এ জন্য নারীদের স্বার্থ - যা বস্তুত জাতীয়
স্বার্থ - জলাঞ্জলি দিতে হবে?
বলা বাহুল্য যে, অতীতে পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদে
প্রতি তিনটি সাধারণ আসনের জন্য একটি নারী আসন সংরক্ষিত ছিল,
উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আবারো তা বলবৎ
করা হয়৷ উপজেলা ও জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে, উপদেষ্টা পরিষদের ২৩
মার্চের নীতিগত অনুমোদন রহিত করে, উপজেলার আওতাধীন সকল স্থানীয়
সরকার প্রতিষ্ঠানের নারী সদস্যেদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ এবং
অনুরূপভাবে জেলা পরিষদের আওতাধীন সকল প্রতিষ্ঠানের নারী
সদস্যদের এক-তৃতীয়াংশকে যথাক্রমে উপজেলা ও জেলা পরিষদের সদস্য
করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করে৷ এছাড়াও মন্ত্রণালয়ের
চূড়ান্ত প্রস্তাবে উপজেলা ও জেলা পরিষদে দুইজন
ভাইস-চেয়ারপারসনের বিধান করা হয়েছে, যার মধ্যে একজন হবে নারী৷
নিঃসন্দেহে উপজেলা এবং জেলা পরিষদে নারী ভাইস-চেয়ারপারসন রাখার
বিধান প্রশংসনীয়৷ তবে এটিকে ‘সান্তনা পুরস্কার’ বলেই মনে হয়,
কারণ এর জন্য
উচ্চ ‘মূল্য’ দিতে হবে৷ একটি প্রাথমিক খসড়া হিসেব
থেকে দেখা যায়, শক্তিশালীকরণ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে,
পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় ২৩ হাজার ২শ’
নারী নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পেতেন৷ তার বিপরীতে, অতীতের পদ্ধতি
ব্যবহার করার ফলে, প্রায় ১৪ হাজার ৮শ’ নারী এ সুযোগ পাবেন৷
অর্থাৎ জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের কথা বাদ দিলেও, প্রতি
জেলায় এবং উপজেলায় একজন করে ভাইস-চেয়ারপারসন (মোট ৫৪৩) পদের
জন্য প্রায় ৮ হাজার ৪শ’ প্রতিনিধি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে
নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে৷ এছাড়াও শক্তিশালীকরণ
কমিটি’র সুপারিশ অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যেখানে নতুন
নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো, মন্ত্রণালয়ের
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে একই নারীরা ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা
পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করবেন৷
দ্রুততার সাথে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আকাঙক্ষার কারণে
স্থানীয় সরকারে অর্থবহ নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি জলাঞ্জলি
দিলেও সকল স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনগুলো
সরকারের পক্ষে করা সম্ভব হয় নি৷ এ পর্যন্ত সরকার মাত্র ৪টি সিটি
করপোরেশন ও ৯টি পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্ন করেছে৷ উপজেলা
নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রায় অদম্য আকাঙক্ষাকে ব্যাপকভাবে কাটছাট
করতে বা বাদ দিতে হয়েছে৷ সরকারের এই অপারগতার একটি অন্যতম কারণ
হলো সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো জারিতে অহেতুক বিলম্ব৷
‘শক্তিশালীকরণ কমিটি’র পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের খসড়া
১৩ নভেম্বর, ২০০৭ তারিখে জমা দেয়া হলেও, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা
অধ্যাদেশ জারি করা হয় ছয় মাস পর ১৪ মে, ২০০৮ তারিখে৷ আর উপজেলা
অধ্যাদেশ জারি করা হয় ৩০ জুন, ২০০৮ তারিখে৷ কেন এবং কার
স্বার্থে এত বিলম্ব? কারা এর জন্য দায়ী?
মাননীয় স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্য
অতীতের পদ্ধতি ব্যবহার করলেও নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিদেরকে
সম-দায়িত্ব দেয়ার কথা বলেছেন৷ আমাদের আশংকা, এটি সম্ভব হবে না,
কারণ অতীতের পদ্ধতি বৈশিষ্টগতভাবেই বৈষম্যমূলক - এ পদ্ধতিতে
নারীদেরকে তিনটি সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত হতে হয় এবং এটি
নারীকে বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে (বীপষঁফব) রাখে৷ এছাড়াও
অভিজ্ঞতা হলো যে, ২০০৪ সালের হাইকোর্টের রায়ের পর মন্ত্রণালয়ের
পক্ষ থেকে পরিপত্র জারি করে নারীদেরকে অধিক ক্ষমতা প্রদানের
প্রচেষ্টা হয়েছিল, যা সফল হয় নি৷
এটি সুস্পষ্ট যে, স্থানীয় সরকারে নারী প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে
বর্তমান সরকারের ওয়াদা ভঙ্গ নারীদেরকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নের
একটি অপূর্ব সুযোগ বিনষ্ট হয়ে গেল৷ এর ফলে স্থানীয় সরকারে
অর্থবহ নারী প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার পথই রুদ্ধ হলো না, অদূর
ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব কার্যকরভাবে বৃদ্ধির
সম্ভবনাও অনিশ্চিত হয়ে গেল৷ তা সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যবশত আমাদের
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে কোন অবস্থান নিতে ব্যর্থ
হয়েছে৷ এমনকি আমাদের নারী সংগঠনগুলোও এর প্রতিবাদে তেমন
উচচবাচ্য করে নি৷ কিন্তু এর মাশুল জাতি হিসেবে আমাদেরকে
ভবিষ্যতে গুণে যেতে হবে৷ |
|