|
|
পৃথিবীতে মানুষ অপার সম্ভাবনা নিয়ে
জন্মায়৷ একসময় মরেও যায়৷ রেখে যায় স্মৃতিময় কর্ম, যা মানুষকে
স্মরণীয় করে রাখে৷ যার উদ্দেশ্যে এত কথা বলছি তিনি সাঈদা
আক্তার৷ সাঈদার জন্ম ১৯৬৯ সালে ২০ সেপ্টেম্বর জামালপুর জেলার
পাথালিয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে৷ পাথালিয়া গ্রামটি
শহরের উপকেন্দ্রে অবস্থিত৷ বাবা মৃত মোতাহার আলী, মা মৃত ছাকিনা
খাতুন৷ বাবা আনছার ছিলেন৷ পরে অবশ্য ব্যবসা করতেন৷ ১০ ভাইবোনের
মধ্যে সাঈদা সপ্তম৷ এক ছেলে আর এক মেয়ের জননী সাঈদার বয়স এখন
প্রায় ৪০ বছর৷ বড়ভাই বোনের মধ্যে সবাই কমবেশি লেখাপড়া করেছেন৷
ছোটবেলা থেকেই তিনি বেশ শান্ত৷ সপ্তম অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালে
সাঈদার স্কুলে যাবার পথে পড়তো দাতব্য চিকিৎসালয়৷ সেই চিকিৎসা
কেন্দ্র থেকে নিজের নামে ঔষধ উঠিয়ে গ্রামের অসহায়, দরিদ্র
মানুষের মধ্যে বিতরণ করতেন৷ এটিই যেন ছিলো তার নিত্যদিনের কাজ৷
গ্রামের অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে পারলে তার খুব ভালো লাগতো৷
খুব খুশিও হতেন৷ এভাবে মানুষের সেবা করার মধ্য দিয়ে সামাজিক
কাজ করার মানসিকতা তৈরি হয়ে যায়৷
তারপর থেকে সাঈদার স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় বড় হয়ে ডাক্তার হবেন৷
ডাক্তার হয়ে অসহায়, দরিদ্র, নির্যাতিত মানুষের সেবা করবেন৷
লেখাপড়ার পাশাপাশি সাঈদা রেডক্রিসেন্টের সাথে যুক্ত হন এবং
রেডক্রিসেন্টের মাধ্যমে বন্যা কবলিত অসহায় মানুষের মাঝে ত্রাণ
বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেন৷ ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে সেই কৈশোরেই
উপলদ্ধি করতে পারেন যে, অসহায় মানুষের জন্য তার প্রাণটা মাঝে
মধ্যেই অস্থির হয়ে ওঠে৷ কখনও বা ভাবেন বড় হয়ে এইসব মানুষের
জন্য স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেবেন৷ তার কোমল
মনটা অসহায় মানুষের জন্য কাঁদে- কিন্তু তার সাধ আছে, সাধ্য নেই৷
সাঈদা স্বপ্নপূরণের জন্য নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন৷
১৯৮৬ সালে এসএসসি পাশ করেন৷ তারপর ১৯৮৯ সালে এইচএসসি পাশ করেন
আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে৷ লেখাপড়ার পাশাপাশি সাঈদা সেবামূলক কাজ
চালিয়ে যেতে থাকেন৷ তার শিক্ষকগণ ও পরিবারের সদস্যরা তাকে এ
বিষয়ে উৎসাহিত করেন৷ এতে করে সাঈদার মনোবল আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে৷
তারপর সাঈদা আর্থিক সংকট এবং পারিপার্শ্বিকতার কারণে এমবিবিএস
ডাক্তার হতে পারেননি৷ কিন্তু তাই বলে তিনি তার স্বপ্ন একেবারে
বিসর্জন দিতে রাজি ছিলেন না৷ সাঈদা তার সেই প্রত্যাশা পূরণের
জন্য সরিষাবাড়ি উপজেলা হোমিওপ্যাথিক কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৯৬
সালে উক্ত কলেজ থেকে ডিএইচএমএস পাশ করেন৷
সাঈদার বাবা একদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ আত্মীয়-স্বজন সবাই
দেখতে এসেছে৷ বাবার অসুস্থতার মধ্যে বাড়িতে কিসের যেন আয়োজন
চলতে থাকে৷ সেদিন পরিবারের সবাই ব্যস্ত এবং চঞ্চল৷ কিন্তু কেন
এই পরিবর্তন? এত সব কিছু কিসের আয়োজন? এইসব বিষয় সাঈদাকে
ভাবনায় ফেললেও সে কাউকে কোনো প্রশ্ন করতে পারছে না৷ তার চোখে
মুখে শুধু মুমূর্ষ বাবার প্রতিচছবি৷ আনন্দের কোনো ছোঁয়া নেই৷
মুমূর্ষ বাবাকে দেখতে অনেক জায়গা থেকে অনেক লোকজন আসছে৷ অসুস্থ
বাবাকে দেখতে আসা লোকদের মধ্যে থেকে সাঈদাকে পছন্দ করে এবং সেই
দিনই বিয়ের ব্যবস্থা করতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা৷ তখনও কিছুই
বুঝে উঠতে পারছে না৷ হঠাৎ তার কাছে সংবাদ এলো, তার বিয়ে হবে আজ
রাতে৷ একদিকে মুমূর্ষ পিতা অন্যদিকে বিয়ে৷ অনিচছা সত্ত্বেও
সাঈদাকে সেদিন বিয়েতে রাজী হতে হলো৷ কারণ বিয়েতে রাজী না হলে
তা হবে বেয়াদবী, অভিভাবকদের অপমান করা৷ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়
রয়েছে এমনই কিছু নিয়মনীতি৷ এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়
কোনো কিছু বলার মতো সৎ সাহস তার ছিলো না৷ তার স্বামীর নাম
এহতেশামুল হক (ফুরান)৷ তিনি অগ্রগতি নামে একটি সামাজিক সংগঠনের
নির্বাহী পরিচালক৷ বর্তমানে সংগঠটির তেমন কোনো কার্যক্রম নেই৷
বিয়ের পরের দিনই সাঈদার বাবা মারা যান৷ তার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে
পড়লো৷ বাবার মৃত্যুর পরে সাঈদার সংসারে অভাব অনটনের সূচনা হয়৷
একদিকে সংসার, অন্যদিকে জনসেবা৷ তখনো সাঈদা রোগী দেখে কোনো টাকা
নেন না৷ এমনকি নিজের কেনা ঔষধ দিয়ে রোগীদের মধ্যে বিতরণ করতে
থাকেন৷ সাঈদা আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের জন্য সেলাই
প্রশিক্ষণ(দর্জি বিজ্ঞান), ব্লক-বাটিকের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ
করেন৷ তার সেবা করার মানসিকতা দেখে এলাকার লোকজন তাকে নির্বাচনে
অংশগ্রহণ করার অনুরোধ করেন৷ এলাকার জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে
সাঈদা ১৯৯৯ সালে সদর উপজেলার পৌরসভার কমিশন পদে নির্বাচন করেন
এবং জনসাধারণের ভোটে কমিশনার নির্বাচিত হন৷ উল্লেখ্য যে, তার
নির্বাচনের অধিকাংশ খরচ এলাকার জনগণ বহন করেন৷ নির্বাচনের
একদিন পরেই তার মায়ের স্ট্রোক হয় এবং প্রায় দুমাস অচেতন থেকে
তিনি ১৯৯৯ সালের ৪ এপ্রিল মারা যান৷
বাবা মায়ের মৃত্যুর পরও সাইদার মনোবল একটুও কমেনি৷ নিজের সংসার
পরিচালনার চেয়ে তার কাছে জনসেবাই যেন বড় কাজ হয়ে দাঁড়ায়৷ একদিকে
নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে এলাকার উন্ন্য়নের জন্য কাজ করে
চলেছেন, অন্যদিকে এলাকায় অসহায় নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য
‘সৃষ্টি মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছেন৷
এ সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে সাঈদা৷ সমিতির সদস্য সংখ্যা তিনশো
জনের মতো৷ নয় সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি আছে৷ এ কমিটির
মাধ্যমে সংগঠনটি পরিচালিত হয়৷ সংগঠনটি সমাজকল্যাণ বিভাগের
রেজিস্ট্রেশন ভুক্ত৷ এছাড়া তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার সহযোগিতায়
মিনি গার্মেন্টসের উপর ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ সাঈদা
দুর্বার নেটওয়ার্ক ও পুলিশিং কমিটিসহ বিভিন্ন সংস্থার ও কমিটির
সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন৷
সাঈদা এক সময় জানতে পারেন, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট নামক
স্বেচছাব্রতী সংগঠনের কথা৷ দি হাঙ্গার প্রজেক্টের আহবানে ২০০৬
সালে পূর্বাঞ্চলের ময়মনসিংহে ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক’-এর
দ্বিতীয় ফাউন্ডেশন কোর্সে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়৷ এ
প্রশিক্ষণের ফলে সাঈদার জীবনে আসে আমূল পরিবর্তন৷ পাল্টে দেয়
তার চিন্তা চেতনাকে৷ শুরু হয় এক নতুন অগ্নিপরীক্ষা৷ তারপর তিনি
এলাকার নির্যাতিত, বঞ্চিত, অবহেলিত নারীদের পাশে এসে দাঁড়ালেন৷
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে নানান ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ
করতে থাকেন৷ বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, যৌতুক বিরোধী বিভিন্ন ধরনের
কাজ করে এলাকার মানুষকে সচেতন করতে থাকেন৷ পাশাপাশি বেকার
মেয়েদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য নিজে পঞ্চাশ হাজার এবং এক লাখ
টাকা ঋণ নিয়ে মোট দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন সমিতিতে৷ বাইরে
থেকে সেলাইয়ের বিভিন্ন ধরনের অর্ডার নিয়ে সমিতির সদস্যদের নিয়ে
কাজ করান এবং যাদের নিয়ে কাজ করান তাদেরকে কাজের ভিত্তিতে
পারিশ্রমিক দেন৷ এখন সমিতির সদস্যরা নিজেরাই সেলাই মেশিন
কিনেছেন এবং বাড়িতে বসে কাজ করে সমিতিতে জমা দেন৷ অসহায়
নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে নিরন্তর প্রচেষ্টার মধ্যে
দিয়ে কাজ করে চলেছেন৷ প্রতিমাসে সমিতি থেকে সাঈদার পনেরো হাজার
টাকার মতো আয় হয়, যা দিয়ে তিনি তার সংসারের খরচ চালান৷
এরপরে তিনি দি হাঙ্গার প্রজেক্টের আয়োজনে ২০০৮ সালে ১৩৪৭তম
ব্যাচে উজ্জীবক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন৷ প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর
সাঈদার আত্মশক্তি যেন আরো বেড়ে গেলো৷ আত্মশক্তিতে বলীয়ান
ব্যক্তি কখনও দরিদ্র থাকতে পারেনা- এই মন্ত্রই যেন সাঈদাকে আরো
সামনের দিকে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা যোগায়৷ প্রশিক্ষণের
মাধ্যমে সাঈদা সামনে এগিয়ে যাবার পথ খুঁজে পান৷
আরও বৃহত্তর পরিসরে জনগণের সেবা করার জন্য সাঈদা সম্প্রতি
অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন৷ যদিও তিনি নির্বাচিত হতে পারেননি;
কিন্তু এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাবেন৷ ভবিষ্যৎ
পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে সাঈদা বলেন,‘ভবিষ্যতে বেকার
মেয়েদের জন্য গার্মেন্টস কারখানা করার ইচছা আছে৷ বঞ্চিত,
অবহেলিত নারীদের সবসময় যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে চাই’৷
তাছাড়া ভারতের কলকাতা থেকে ইঐগঝ ডিগ্রি অর্জন করে ডাক্তারি
পেশার মাধ্যমে জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করারও ইচেছ আছে
তার৷ তিনি এমন কাজ করে যেতে চান যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাকে
স্মরণ করেন৷
নারীদের অধিকার সমন্ধে সাঈদা তার সমিতির সকলকে সচেতন করে
সংগঠিত করেছেন৷ নারী নির্যাতন বিরোধী একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে
তুলেছেন৷ কোথাও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তার তীব্র প্রতিবাদ
করে জনগণের সেবা করা যেন তার নেশা ও পেশায় পরিণত হয়েছে৷ নারী
নির্যাতনের বিরুদ্ধে জামালপুরে সাঈদা যে লড়াই চালিয়ে যাচেছন
তার ধারাবাহিকতায় অন্তরালের ঘটনাগুলোও বাইরে বেরিয়ে আসবে৷
সংগঠিত হবে সামাজিক প্রতিরোধ, গড়ে উঠবে নারী পুরুষ বৈষম্যমুক্ত
বাংলাদেশ৷ যেখানে থাকবে না ক্ষুধা, দারিদ্র, অবিচার, অনাচার-
এটাই সাঈদা আক্তারের প্রত্যাশা৷
|
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |