|
|
গুণ গুণ করে গান গাওয়া আর বই হাতে
নিয়ে স্কুলে যাওয়া৷ স্কুল থেকে ফিরে গোল্লাছুট, বউছি খেলা
এভাবেই দিন কাটছিলো সাজেদার৷ মা-বাবার প্রথম সন্তান৷ দাদা-দাদি,
মা-বাবা সকলের অনেক আদরের৷ সাজেদার সব আবদার পূরণ করতে হতো৷
বাবা সাঈদুর রহমান পেশায় গ্রাম্য ডাক্তার এবং পাশাপাশি
কৃষিকাজের সাথেও জড়িত৷ সাজেদারা পাঁচ বোন ও চার ভাই৷ তার ইচছা
লেখাপড়া শিখবেন, গানবাজনা করবেন মানুষের মত মানুষ হবেন৷ ছোটবেলা
থেকেই তার গান গাওয়া ও কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল৷ স্কুলে পড়ার
সময় তিনি তার গ্রামের মোল্লাবাড়ির এক চাচার বাড়িতে সেলাইয়ের
ক্জা শিখতেন গোপনে৷ বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল৷ তার
পরিবার অনেকটা রক্ষণশীল ছিল৷
সাজেদা যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন, তখন থেকেই তার চাচাতো ও ফুফাতো
ভাইয়েরা তাকে বিয়ে করার জন্য উত্ত্যক্ত করতো৷ কিন্তু সাজেদা
বিয়ের কথা তখন চিন্তাই করেননি৷ তার ইচছা লেখাপড়া শিখে মানুষের
মত মানুষ হওয়া৷ পরিবার থেকেই চাপ আসতে থাকে বিয়ের জন্য, কিন্তু
পরিবার ও পারিপার্শ্বিক সমস্যা এতই প্রকট যে, সাজেদাকে তার
ইচছার বিরুদ্ধেই বিয়ে করাতে বাধ্য করা হয়৷ সে সময় সাজেদা
জানতেন না কেমন ছেলের সঙ্গে বিয়ে হচেছ৷ ছেলের বড় ভাইয়ের খুবই
আগ্রহ ছিল সাজেদাকে তার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বউ করে নিয়ে
যাওয়ার জন্য৷ সাজেদা যখন নবম শ্রেণির ছাত্রী ও বয়স পনের বছর,
ঠিক তখনই বাবা বিয়ে দিয়ে দেন৷ স্বামী জিয়াউদ্দীন একজন
মুক্তিযোদ্ধা ও তার বয়স তখন বত্রিশ বছর৷ বাড়ি গাজীপুর জেলার
কালীগঞ্জের তুমুলিয়া গ্রামে৷
সাজেদার সংসার শুরু হলো৷ যৌথ পরিবার৷ স্বামীর সংসারে পরিবারের
সদস্য সংখ্যা ১০-১২ জনের মতো৷ বিয়ের পর স্বামী মানসিক ও
শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন৷ সাজেদা শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে একটা
মানসিক ভারসাম্যহীন অসুস্থ স্বামীকে পেলেন৷ যৌথ পরিবার, বয়স কম,
কর্তব্য, সংসারের কাজকর্ম প্রভৃতি দায়িত্ব তাকে অনেকটা চিন্তার
মধ্যে ফেলে দিল৷ আস্তে আস্তে নামের পরিবর্তন হয়ে শিল্পী রহমান
সাজেদা নামে তিনি পরিচিত হলেন শ্বশুরবাড়িতে৷ তার বড় ভাসুর
সাজেদাকে বিয়ে দিয়ে অনেকটা অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন৷ সাজেদা
ভালো গান গাইতেন ও কবিতা লিখতেন৷ তাই বড় ভাসুর তাকে স্নেহ করে
‘শিল্পী’ নামে ডাকতেন৷
সাজেদা শ্বশুরবাড়িতে করুণার পাত্র হয়ে ছিলেন৷ সংসারের সকল কাজ
সামলানোর পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের হুকুম তামিল করতে হতো৷
কারণ একটাই, তার স্বামী অসুস্থ ও কাজ কর্মে অক্ষম৷ ফলে সাজেদার
মানসিক যন্ত্রণা ছিল খুব বেশি৷ এভাবেই বিয়ের প্রথম বছর কাটতে
না কাটতেই তাদের পরিবারে এক নতুন অতিথির আগমন ঘটে৷ সাজেদার কোলে
আসে এক কন্যাসন্তান৷ সাজেদা খুব চাপা স্বভাবের৷ তার সমস্যার কথা
সহসা তার মা-বাবার কাছে প্রকাশ করতেন না৷ কিন্তু সমস্যা যে একটা
আছে সেটা তারা এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন৷ ইতোমধ্যে প্রথম সন্তান
জন্মের ঠিক এক বছর পরেই আবার দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম হয়৷
তারপরই সাজেদার বাবা তার মেয়েকে আর শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে অনীহা
প্রকাশ করেন৷ কিন্তু সাজেদা সিদ্ধান্ত নেন তিনি শ্বশুরবাড়িতে
যাবেন এবং এই স্বামীকে নিয়েই সংসার করবেন৷ এর মধ্যে গোপনে
সাজেদার চাচাতো ভাই সাজেদাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন৷ কিন্তু
সাজেদা রাজী হন না৷ তিনি মনে করেন বিয়ে মানুষ একবারই করে৷ বিয়ে
আর তিনি করতে রাজী হন না৷ এভাবেই সাজেদার পরে আরো দুটি কন্যা
সন্তানের জন্ম হয়৷ তিনি বর্তমানে চার কন্যা সন্তানের জননী৷
অভাব অনটনের সংসারে সাজেদা চাকরি করার সিদ্ধান্ত নেন৷ মিরপুরে
তার মামার কাছে চাকরির কথা বললে তিনি সাজেদাকে গার্মেন্টসের
চাকরি যোগাড় করে দেন৷ অতিকষ্টে সাজেদা তার মেয়েদের মানুষ করতে
থাকেন৷ তবে সাজেদা তার মামাবাড়িতে থেকে চাকরি করলেও তার বড়
ভাসুর তার সংসারের কিছুটা ভরণপোষণ বহন করতেন৷ ছয় বছর চাকরি
করার পর সাজেদা আবার শ্বশুরবাড়ি কালীগঞ্জে ফিরে যান৷ সেখানে
গিয়ে ‘কারিতাস’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ সহযোগিতা
নেন৷ ঋণের টাকায় সেলাই মেশিন কিনে সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন৷
সেলাইয়ের কাজ শুরু করার কারণে সাজেদার আর্থিক সচছলতা ফিরে আসে৷
তিনি স্বামীর পেটের টিউমার অপারেশন করানোর ব্যবস্থা করেন৷ এবং
স্বামীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলেন৷ স্বামী এখন একজন সফল
ব্যবসায়ী৷ সাজেদা ব্র্যাকসহ নানা সংগঠনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের
সাথে যুক্ত ছিলেন৷ এলাকার নারীনেত্রী নাহিদ সুলতানার কাছে জানতে
পারেন যে, হাঙ্গার প্রজেক্টের মাধ্যমে বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক
নামক সংগঠনের নেতৃত্ব বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে৷
২০০৮ সালের জুলাই মাসে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাজেদা
নিজেকে আরো প্রতিষ্ঠিত করতে উৎসাহী হন৷ বর্তমানে তিনি গ্রামের
নারীদের নিয়ে আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত৷ ভবিষ্যতে
তার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করার ইচছা আছে, কারণ তিনি মনে
করেন এর মাধ্যমেও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে৷ তাছাড়াও ৩০ জন
নারী নিয়ে ‘পল্লী-সমাজ’ নামে একটি নারী সংগঠন তৈরি করেন ২০০৭
সালের জুলাই মাসে৷ গ্রামের নারীরা যেন এই সংগঠনের মাধ্যমে
সংগঠিত হয়ে কাজের সুযোগ পান, সেই লক্ষ্যেই তিনি এ সংগঠনটি
প্রতিষ্ঠা করেছেন৷
|
|
|
Contact Us
3/7 Asad Avenue Mohammodpur,
Dhaka-1207
Ph-(880-2) 8112622, (880-2) 8127975,
Fax-(880-2) 8116812, E-mail-thpb@bangla.net |